ব্যবসায়িক কাজে আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে কলকাতা রওনা দিয়েছি। পুরান ঢাকার আদালতপাড়া থেকে নন-এসি গাড়ির টিকিট বুক করা ছিল। গাড়ি ছাড়বে রাত ১১টায়। গাড়ি দিয়ে পাটুরিয়া ফেরি পার হয়ে যশোর হয়ে বেনাপোল পৌঁছাব খুব ভোরে। যাওয়ার সব আয়োজন চূড়ান্ত। আমরা চারজন একসঙ্গে যাচ্ছি। রাত ১১টায় যথাসময়েই গাড়ি ছাড়ল। আমরা মধ্য রাতে পাটুরিয়া গিয়ে ফেরির জন্য লাইন ধরলাম। তবে ফেরি পেতে বেশি সময়ের প্রয়োজন পড়ল না।
ফেরি যখন পদ্মার মাঝ নদীতে তখন বাঁধল বিপত্তি। আকাশ কালো করে চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে ঝড়ের বলয়। ফেরিতে থাকা গাড়ির যাত্রীদের কেউ কেউ তখন নেমে ফেরির ডেকে হাঁটাহাঁটি করছিল । আবার বিশাল নদীর ঢেউ কেউ উপভোগ করছিল। কেউ মুড়ি খাচ্ছিল কিনে। হঠাৎ ঝড় শুরু হওয়ায় চারদিকে শোরগোল শুরু হয়ে গেল। মানুষ ঝড়ের তীব্রতায় পড়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। নারী ও শিশুদের কান্নায় ফেরিতে থাকা দায়। আমি নিজেও দোয়া ইউনুস পড়তে লাগলাম। দোয়া পড়তে পড়তে চোখ গেল নদীর পাড়ে। যাক, আল্লাহ পাক এ যাত্রা রক্ষা করেছেন। গাড়ি ফেরি থেকে নেমে দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। তখনো দেখলাম অনেকের মুখ থেকে ভয়াল ঝড়ের আতঙ্ক এখনো কাটেনি। একটা সময় সব বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে আমরা চলে এলাম বেনাপোল।
ইমিগ্রেশন পার করার সময় অনেক নাটকীয়তা ঘটে এখানে। অনেক ধরনের অনৈতিক বাণিজ্য চলে। তাই এ জায়গায় সব সময়ই সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। ইমিগ্রেশন পার হতেই একজন অফিসার বললেন, কত টাকা আছে? বললাম- ২৫ হাজার। তিনি না শোনার ভান করে বললেন, ৫ হাজার? আমি যদি তখন ৫ হাজার বলতাম তখনই তিনি পকেটে হাত দিয়ে চেক করতেন। বাকি টাকা নিয়ে যেতেন। তারপরও তাকে ৫০০ টাকা দিতে হলো। ইমিগ্রেশন পার হতে গিয়ে একজন অফিসার কাগজপত্র দেখাতে বললেন, নিজের পরিচয় দিলাম। অতঃপর ছাড়া পেলাম সেখান থেকে।
ইমিগ্রেশনের প্রতিটি ইট-পাথর এখানে মুখ হা করে বসে থাকে টাকা খাওয়ার জন্য। অনেককেই দেখেছি সামান্য বিষয় নিয়ে অন্যকে বিপদে ফেলতে। ইমিগ্রেশন পার হয়ে অপর প্রান্তে গেলাম। সেখান থেকে বনগাঁ রেলস্টেশনে যেতে হবে। জনপ্রতি ভাড়া ৫০ টাকা। গাড়ি ছেড়ে যেই বনগার দিকে যেতে শুরু করল অমনি শরীরে একটা শীতল বাতাসের অনুভূতি পেলাম। না, এটা গাড়িতে রাখা কোনো এসি বা ফ্যানের বাতাস নয়। সড়কের দুই পাশে বড় বড় কড়ই গাছ দেখতে পেলাম। বিশাল আকৃতির গাছগুলোই এসির কাজ করছে। গাছেরা অক্সিজেন দিয়ে পুরো সড়কটি শীতল করে রেখেছে। সেদিনই উপলব্ধি করলাম একটা বড় গাছ কী পরিমাণ অক্সিজেন দেয়। প্রকৃতি পরিবেশটাকে কীভাবে সুশীতল ছায়াময় করে রাখে।
গাড়ি এসে থামে বেনাপোল রেলস্টেশনে। এখান থেকে আধা ঘণ্টা পর পর রেল ছাড়ে কলকাতার উদ্দেশ্যে। আমরা এখান থেকে উঠেই সিট পেলাম। আমাদের কাউকেই দাঁড়িয়ে যেতে হলো না। বিপত্তি বাঁধল সামনের স্টেশনে পৌঁছাতেই। সেখানে মানুষের হুড়োহুড়ি। কে কার আগে উঠবে তার প্রতিযোগিতা চলছে। তার কারণ এখন অফিস যাত্রার সময়। রেলগাড়িতে অল্প ভাড়ায় এবং সহজেই কলকাতা শহরে পৌঁছানো যায়। তার জন্যই এমন নাজেহাল পরিস্থিতি। আমার পাশের একজন যাত্রী জোর করেই উঠিয়ে এক ভদ্রলোক সিট দখল করলেন। তার যুক্তি তিনি (পাশের যাত্রী) অনেকক্ষণ বসে এসেছেন। এখন তাকেও বসতে দিতে হবে। সেই ভদ্রলোক জানেন এরা অন্য দেশের লোক। এখানে তারা জোর খাটাতে পারবেন না। সে দুর্বলতাটুকুই সেখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত কাজে লাগান।
কলকাতায় পৌঁছে বড় বাজারে কাছে একটা হোটেলে আমরা উঠি। এখানে রবিবারের হোটেল বুকিং অনেক বেশি থাকে। তাই একটি মোটামুটি মানের হোটেলে উঠেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হলো। তা ছাড়া ব্যবসায়িক কাজ। অন্য কোথাও উঠলেও সুবিধা হবে না। হোটেল ম্যানেজারকে বললাম পানির কথা। তিনি বললেন, আপনাকে এখানে পানি খেতে হবে না; বাংলাদেশে গিয়ে পানি খেয়েন। এ যখন অবস্থা তখন আর কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। দু-এক দিনের মধ্যেই ব্যবসার মাল কিনে ফেললাম। সেখান থেকে আমরা কাঠ জোড়া দেওয়ার জন্য ফোম আঠা আমদানি করে থাকি। এক কেজি আঠা সেখানকার ৭০০ টাকা দামের জন্য বেনাপোলে শুল্ক দিতে হয় আরও ২০০ টাকা। কিন্তু আমরা সে টাকা দিতে প্রস্তুত। কিন্তু যারা শুল্ক নেন তারা এটা পছন্দ করেন না।
তাদের কথা হলো টাকা তাদের দাও আর শুল্ক ছাড়া গাড়ি বোঝাই করে মাল নিয়ে যাও। এ জায়গাটিতেই আমার আপত্তি। আমি অনড় শুল্ক ছাড়া মাল নেব না। অনৈতিকতার বেড়াজালে জড়াব না। তখন আমার আত্মীয় ভদ্রলোক বললেন, তাদের কথা না শুনলে মাল নিয়ে জটিলতা তৈরি হবে। আমি আমার কথায় অনড়। আমার বুকিং এজেন্ট আরও অনেকের মাল নিয়ে যখন পুরো শুল্ক দিয়ে গাড়ি ছাড়ার অনুমতি পেল তখনই বেনাপোলের লোভি-অসৎ মানুষগুলো আমার মালগুলোতে চেকিংয়ের নামে মালের অনেকগুলো কার্টুন বোঙ্গা দিয়ে ফুটো করে দিল। ১৮ বোতল ফুটো হয়ে তা জমে গিয়ে অন্যান্য বোতলও জমে নষ্ট হয়ে গেল। এভাবেই অনৈতিকতার সঙ্গে না জড়িয়ে সম্পূর্ণ শুল্ক পরিশোধ করে নিজে ষোলো আনা ক্ষতির শিকার হলাম।
বেনাপোল পার হয়ে আমড়াখালি পৌঁছাতে আমাদের ফিরতি পথের চেকিং শুরু হলো। সবাইকে নেমে যেতে হলো গাড়ি থেকে। এখানে অনেক ব্রিফকেস পার্টি আছে। তারা বিভিন্ন লোকের মালামাল ঢাকায় পৌঁছে দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। এমন অনেক মানুষের মাল আটকে রাখছেন বিজিবি সদস্যরা। অনেকের অর্ধেক মাল রেখে দিয়ে বাকি মাল ফেরত দিচ্ছেন। আমার ব্যাগ তল্লাশি করে সামান্য মাল দেখে বিজিবির একজন সদস্য খুশি হতে পারলেন না। কিন্তু তিনি আমার দুটি থ্রি-পিস থেকে একটি রেখে দিলেন। আরও কিছু রাখার জন্য তার শকুনি চোখ দুটো চিক চিক করতে থাকে। কিন্তু নেওয়ার মতো কোনো মাল আর পেল না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)