পৃথিবীর সুন্দর দেশগুলোর মধ্যে একটি নরওয়ে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এই দেশটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। একে বলা হয় ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’। নরওয়েকে নিশীথ সূর্যের দেশ বলা হয় কারণ এর উত্তর মেরু অঞ্চলের কিছু অংশে গ্রীষ্মকালে সূর্য প্রায় অস্ত যায় না এবং মধ্যরাতেও দেখা যায়। পৃথিবীর অক্ষের হেলানো বিন্যাস এবং মেরু বৃত্তের বাইরে অবস্থানের কারণে এই ঘটনা ঘটে, ফলে গ্রীষ্মের সময় ওই অঞ্চলে একটানা সূর্যালোক থাকে। গ্রীষ্মকালে নরওয়েতে রাতের বেলাও সূর্যের দেখা মিললেও শীতকালে কিছু কিছু জায়গায় দিনের বেলা সূর্যের দেখাই মেলে না কিংবা অন্ধকার থাকে। দিনের দেখা পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। টানা কয়েক মাস এভাবে চলতে থাকে। এই অন্ধকার থেকে বাঁচতে নরওয়ের এক গ্রামে আছে অভিনব এক পন্থা। যেখানে কৃত্রিমভাবে সূর্যের আলো পৌঁছানো হয়।
আরো পড়ুন: আত্মভোলা ছিলেন আইনস্টাইন
দক্ষিণ নরওয়ের ভেস্টফজর্ড উপত্যকায় অবস্থিত রজুকান নামে চমৎকার এক গ্রাম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এক গ্রাম। তবে পাহাড়ে ঘেরা এই গ্রামকে বছরের দীর্ঘ একটা সময় ধরে অন্ধকারে থাকতে হয়। উঁচু পাহাড়ের দেয়াল সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সরাসরি সূর্যালোক আটকে রাখে। যা রজুকানকে শীতের সময় অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। তাই বাসিন্দারা শীতকালে কেবল রোদের জন্য কাছাকাছি পাহাড়ে উঠতেন। তাই গ্রামে এক বিকল্প পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সেখানে স্থাপন করা হয়েছে বিশাল বিশাল আয়না, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে গ্রামে আলো দেয়। বিভিন্ন পাহাড়ের ওপর স্থাপন করা হয়েছে এসব কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত আয়না। শীতকালে সূর্যের আলোর অভাব এভাবেই মোচন করেন তারা।
১৯০৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে স্যাম আইড নামে এক ব্যক্তি নরওয়ের এই এলাকায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেন। সেই কারখানার পাশেই গড়ে ওঠে রজুকান গ্রামটি। চারপাশে পাহাড় ঘেরা এই গ্রামে বসবাস করতে শুরু করেন কারখানার কর্মীরা। পরে দেখা যায় শীতকালে গ্রামটি সূর্যের আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই স্যাম আইড গ্রামে একটি ঘূর্ণায়মান আয়না স্থাপনের চেষ্টা করেন, যা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করবে। কিন্তু তখন তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। পরে একটি কেবল কার স্থাপন করেন। যা দিয়ে গ্রামের বাসিন্দারা সূর্যের আলোর ছোঁয়া পেতে পাহাড়ে উঠত। এর শত বছর পরে আয়না স্থাপন করা হয় গ্রামে। ২০০৫ সালে শিল্পী এবং শহরের বাসিন্দা মার্টিন অ্যান্ডারসেন, রজুকানের আয়না প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করেন। স্থানীয় সহায়তা ও তহবিল সংগ্রহ করে কাজটি শুরু করা হয়। ১৭ বর্গমিটারের তিনটি আয়না হেলিকপ্টারে করে আনা হয় এবং ৪৫০ মিটার ওপরে স্থাপন করা হয়। এই আয়নাগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে আলো ফেলে গ্রামে। প্রায় ৬০০ বর্গমিটার আকারের একটি উপবৃত্ত তৈরি হয়। যা সূর্যের আলোর তীব্রতা অনেকাংশে ধরে রাখে। এই আয়না শীতকালীন সূর্যের আলোর প্রয়োজনীয়তা ও বিষণ্নতা পূরণ করে অনেকাংশে।
নরওয়ের গ্রামটি এই আয়নার জন্য বেশ বিখ্যাত। শীতকালীন অন্ধকার ও প্রয়োজনীয় সূর্যের আলোর পাশাপাশি এই আয়নার ফলে পর্যটক আকর্ষণ করছে এই গ্রাম। প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর গ্রামে এই আয়না স্থাপন উদযাপন করা হয়। সেদিন এই গ্রামের বাসিন্দারা ভিড় জমান, শিশুরা সানগ্লাস পরে, পতাকা উড়ায়। একসঙ্গে সবাই উৎসব করে।
তারেক/
.jpg)