ইরানের উত্তর-পশ্চিম জাঞ্জান প্রদেশের চেহরাবাদ লবণখনি বিশ্বের প্রত্নতত্ত্বে এক বিস্ময়কর অধ্যায় যোগ করেছে। এই খনির গভীরে পাওয়া গেছে সংরক্ষিত একাধিক মানুষের দেহাবশেষ, যা ‘লবণ মানুষ’ (The Saltmen) নামে পরিচিত। এই দেহাবশেষগুলো ধারণা করা হচ্ছে প্রায় ১৩০০ থেকে ২৪০০ বছর আগের এক ট্র্যাজিক মুহূর্তকে অক্ষত অবস্থায় ধরে রেখেছে, যা প্রাচীন পারস্যের জীবনযাত্রার এক দুর্লভ জানালা খুলে দিয়েছে।
১৯৯৩ সালে প্রথম ‘লবণ মানুষ’টির (Saltman 1) খোঁজ পান খনি শ্রমিকরা। অনেকগুলো চাপা পড়া দেহের মধ্যে কিছু দেহ অন্য প্রাচীন মৃতদেহের মতো পচে যায়নি, খুব বেশি ক্ষতবিক্ষতও হয়নি। এর কারণ সেখানকার খনির পরিবেশ, আশপাশে থাকা ঘন লবণের স্তর প্রাকৃতিকভাবে দেহটিকে মমিতে পরিণত করে রেখেছে। লবণ দেহকোষের জলীয় অংশ শুকিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর পক্ষে পচন ঘটানো সম্ভব হয়নি। এভাবেই বছরের পর বছর অক্ষত রয়ে গেছে ইতিহাস হয়ে।
আবিষ্কৃত এই দেহাবশেষগুলো নিছক কঙ্কাল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিস্তৃত সময় আর ইতিহাস। প্রথম লবণ মানুষটির লম্বা চুল, দাড়ি, পোশাক, চামড়ার জুতা এবং হাতে থাকা সরঞ্জামও প্রায় অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, এই ব্যক্তিরা সাধারণ খনি শ্রমিক ছিলেন, যারা আচমকা খনি ধসের শিকার হয়ে লবণ শিলার নিচে চাপা পড়েন। অনেক পরীক্ষা করে কার্বন-১৪ ডেটিংয়ের মাধ্যমে জানা গেছে, এই লবণ মানুষগুলোর মধ্যে কেউ কেউ সাসানীয় যুগের (প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৭০০ বছর আগে) এবং কেউ কেউ আরও পুরোনো আখমেনিদ যুগের (প্রায় ২,৩০০ বছর আগে) মানুষ ছিলেন। লবণ মানুষের সঙ্গে উদ্ধার হয় আরও কিছু সরঞ্জাম, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- লোহার ছুরি, রুপার কানের দুল, উলের পোশাকের অংশ, চামড়ার দড়ি ও একটি আখরোট- এসবই সেই প্রাচীন যুগের দৈনন্দিন জীবন, প্রযুক্তি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে অমূল্য তথ্য সরবরাহ করে।
খনির এই আবিষ্কারকে গবেষকরা ‘ইতিহাসের এক বিস্ময়কর টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ, এটি কেবল মৃত্যুর প্রমাণ নয়, বরং প্রাচীন পারস্যের শ্রমিকশ্রেণির জীবনের একটি জমাটবাঁধা মুহূর্ত। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে পৃথিবীর অভ্যন্তরের চরম পরিবেশও কীভাবে মানব ইতিহাসের কিছু অধ্যায়কে হাজার হাজার বছর ধরে সুরক্ষিত রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষক দল বিশেষ করে জার্মানির রুহর ইউনিভার্সিটি বোখুম (Ruhr University Bochum)-এর নেতৃত্বে একটি বড় বৈজ্ঞানিক প্রকল্প এই দেহগুলো নিয়ে কাজ করছে, যা পারস্যের প্রাচীন খনিবিদ্যা ও মানুষের ইতিহাসকে নতুনভাবে তুলে ধরছে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এই খনি থেকে ছয়টিরও বেশি প্রাকৃতিকভাবে মমি হওয়া মানব দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সেই সময়ের অনেক কিছুই জানতে পারছেন গবেষকরা। যেমন- তাদের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, দেহের গঠন ইত্যাদি।
বর্তমানে এই সংরক্ষিত দেহাবশেষগুলোর মধ্যে প্রথম লবণ মানুষটির মাথা ও পা তেহরানের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ইরান এবং অন্যান্য দেহাবশেষ জাঞ্জানের জুলফাগারি জাদুঘরে প্রদর্শন ও গবেষণার জন্য রাখা আছে। এই আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী প্রত্নতত্ত্ব এবং প্রাচীন মমি গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)