নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় কাজ করি। বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন চলছে। বর্ষপূর্তির আয়োজন হলে অফিসে একটা আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করে। এ সময় সবাই ব্যস্ত থাকে। তখন পত্রিকার কলেবর বৃদ্ধি পায়। লেখকদের কাছ থেকে অনেক কসরত করে চাহিদাপূর্ণ লেখাটি বের করে আনতে হয়। বারবার ফোনে তাগাদা দেওয়া লাগে। এমনই একটি সংখ্যা বের করার আয়োজন চলছে। সম্পাদক টেবিলে টেবিলে ঘুরে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কার কোন পাতায় কত ইঞ্চি কালার বিজ্ঞাপন যাবে, কোন এজেন্সি এখনো তাদের ম্যাটার পাঠায়নি, তার সবকিছুই একজন সম্পাদকের নখদর্পণে থাকতে হয়। অফিসের সবাই ব্যস্ত। কারও সঙ্গে কথা বলার ফুরসত তখন থাকে না।
সংখ্যার সব আয়োজন যখন চূড়ান্ত। একের পর এক পেস্টারের টেবিলে ট্রেসিং পেপার যাচ্ছে। পেস্টার কালার মিলিয়ে মনোযোগের সঙ্গে পেজ মেকাপ করছেন। চা-সিগারেট তখন আনলিমিটেড। এরই মধ্যে ঘটে গেল এক অঘটন। পেস্টারের রুমে হইচই। দায়িত্বশীল হয়ে দেখতে গেলাম কী হয়েছে। ঘটনা শুনে তো চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। পেস্টার আমাদের পিয়ন রনিকে বিশেষ পুলিশি কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে। চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন। আজকে পিয়ন রনি ধরা খেয়েছে। তাকে ২০ টাকার দুধ চা আনতে বাইরে পাঠানো হয়েছিল। সে চা এনেছিল। কিন্তু পেস্টার চা মুখে দিতেই ধরে ফেলেন রনির জালিয়াতি। সে ১০ টাকার চা এনে তার সঙ্গে পানি ও চিনি মিশিয়ে অফিসের চুলায় গরম করে নিয়মিত পরিবেশন করত। এতদিন কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। কিন্তু বিশেষ সংখ্যার জন্য একজন দরবেশ টাইপের চা খোড় পেস্টার ধরে আনা হয়েছে। তার তেলেসমাতিতেই চায়ের ভেজাল ধরা পড়েছে। পিয়নের শাস্তি হলো- আজ রাতে যত কাপ চা খাবে তা তার পকেট থেকে যাবে। তখনকার সময়ে একজন পিয়নকে বেতন দেওয়া হতো মাত্র তিন হাজার টাকা। অফিসে বেতন দেওয়ার নিয়ম ছিল প্রথমে স্বল্প বেতনের মানুষকে আগে বেতন দেওয়া হতো। প্রথমে ঝাড়ুদার। তারপর পিয়ন।
আমাদের একজন পিয়ন ছিলেন মতিন মিয়া। অত্যন্ত ভালো লোক ছিলেন। পত্রিকার ফাইল আনতে বললেই তিনি বুঝে ফেলতেন কোন ফাইল লাগবে। একদিন মতিন মিয়া আমার সমানে এসে হাজির। মতিন মিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম, মতিন মিয়া আজ কী দিয়ে ভাত খেয়েছেন। বলল, স্যার, ইলিশ মাছ। আমার তো মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। এ লোক বলে কী? তিন হাজার টাকা বেতন। থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকায়। তিনি বেতন পেয়েই প্রথমে এক বস্তা চাল কিনেন। মেয়েকে প্রাইভেট পড়ান, সেখানে টিচারকে ২০০ টাকা বেতন দিতে হয়। ঘরে ডিশ লাইন আছে তাতে খরচ ৫০ টাকা। বাকি যা থাকে তা দিয়ে সে সদরঘাট পাইকারি মাছ ঘাট থেকে কম দামে ইলিশ কিনে খায়। আর অফিসে যাতায়াতের ভাড়ার টাকা জোগাতে তার একটু কষ্ট হয়। অফিসের অনেক ফাইলপত্র কারওয়ানবাজার থেকে হেড অফিস ধানমন্ডি নিয়ে যেতে হয় মতিন মিয়াকে। সে এতটুকু পথ হেঁটে কখনো বা রিকশায় যায়। তবে কমার্শিয়াল ম্যানেজার সাহেব তাকে বেবিট্যক্সি ভাড়ার টাকা দেন। এ টাকা দিয়েই তিনি বাড়ি থেকে অফিসে আসা-যাওয়ার খরচ মেটান।
রাত নেমেছে। পুরোদমে চলছে পত্রিকার কাজ। হঠাৎ করেই অফিসে একটা ছন্দপতনের ঘটনা ঘটল। পেস্টার ভুল করে কালার উল্টো দিক থেকে বসিয়েছে। এদিকে পত্রিকাবাহী গাড়িগুলোও সময়মতো ছেড়ে দেবে। দূরবর্তী জেলায় সবার আগে পত্রিকা দেওয়া হয়। রাতের শেষ ভাগে আশপাশের জেলায় পত্রিকা পাঠানো হয়। আবার নতুন করে কম্পিউটার থেকে ট্রেসিং বের করা হলো। তবে পত্রিকা সময়মতো ধরা গেছে।
একটি পত্রিকা বের করতে ব্যাপক আয়োজন করতে হয়। পত্রিকা বিক্রি করে তখন খরচের পুরো টাকা উঠানো যেত না। ১০০ টাকার পত্রিকা বিক্রি করে তখনকার সময়ে পাওয়া যেত ৬৮ টাকা। তাও অনেক বাকি পড়ে থাকত। বিজ্ঞাপনই ছিল তখনকার সময়ে একমাত্র ভরসা। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল পেয়ে বেতনের জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যেত অনায়াসেই। এখন আর সে সুযোগ নেই।
একটি জাতীয় পত্রিকা প্রথম চাররঙা নিয়ে বাজারে এসেছে। ঢাউস সাইজের। সেখানে কাজ শুরু করলাম। কয়েক বছর পত্রিকাটি বেশ ভালোই চলছিল। হঠাৎ করেই শুরু হলো ছন্দপতন। বেতন বকেয়া পড়ে গেলো ২৪ মাসের। কেউ কেউ বিকল্প ব্যবস্থা করে নিয়েছে। কিন্তু যারা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেননি তাদের সংকট ছিল চোখে পড়ার মতো। অফিসের আনসাররা হইচই শুরু করলে তাদের বেতন শুধু নিয়মিত আসত। বার্তা সম্পাদকের মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন কুমিল্লায়। মেয়ে বাবাকে আসতে বলে, কিন্তু বাবা নীরব। বাবাও চোখের পানি ফেলেন অন্যদিকে মেয়েও চোখের পানি ফেলেন। কম্পিউটার অপারেটর তার দুঃখের কথা জানিয়ে বললেন, তিনি প্রতিদিনের জমানো পত্রিকা বিক্রি করে চাল কিনেছেন। কিন্তু চুলার কাছে গিয়েই বড় ধাক্কা খেলেন। দেখেন স্টোভে জ্বালানি তেল নেই।
এমন হাসি-কান্না নিয়েই চলতে হয় এ জগতে।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)