রোহান তার পুরোনো স্কুলের ফেসবুক গ্রুপটা স্ক্রল করছে। অনেক দিন পর পুরোনো বন্ধুদের স্মৃতিচারণ দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। হঠাৎ একটা প্রোফাইলে তার চোখ আটকে যায়। নাম নীলা চৌধুরী। প্রোফাইল ছবিটা একটা ঝাপসা, ধূসর রঙের মেয়ের। ছবিটার দিকে তাকালে কেমন যেন অস্বস্তি হয়।
কৌতূহলবশত রোহান প্রোফাইলটায় ঢোকে। প্রোফাইলের প্রায় সবকিছুই লক করা। শুধু কয়েকটা পুরোনো স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে। শেষ স্ট্যাটাসটা দেওয়া হয়েছে ঠিক পাঁচ বছর আগে, ঠিক মধ্যরাত ৩টা ৩ মিনিটে। লেখা, ‘আলো নিভে গেল। এবার হারিয়ে যাওয়ার পালা’।
স্ট্যাটাসটার নিচে পুরোনো সব কমেন্ট। কেউ লিখেছে, ‘কী হয়েছে নীলা?’ কেউ লিখেছে, ‘ফোন ধরছিস না কেন?’। কমেন্টগুলো পড়তে পড়তে রোহানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই মেয়েটা পাঁচ বছর আগে নিঃশব্দে, রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গেছে।
একটা বিষণ্ন অনুভূতি নিয়ে রোহান প্রোফাইলটা থেকে বেরিয়ে আসতে যাবে, ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। নীলার প্রোফাইলটা তার চোখের সামনেই একটা নতুন স্ট্যাটাস আপডেট করে! সেখানে শুধু একটা সাদা ছবি পোস্ট করা হয়েছে, ছবির ক্যাপশন- ‘অনেক দিন পর এলাম... ঠাণ্ডা লাগছে’।
রোহানের নিশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। এটা কীভাবে সম্ভব? পাঁচ বছর ধরে নিষ্ক্রিয় একটা প্রোফাইল হঠাৎ করে অ্যাক্টিভ হলো। সে ভাবে, হয়তো মেয়েটার পরিবারের কেউ আইডিটা চালাচ্ছে। কিন্তু তার মাথার ভেতর একটা ক্ষীণ কণ্ঠ ফিসফিস করে— না, এটা কোনো মানুষ নয়।
ভয়ে ভয়ে সে নিজের প্রোফাইলে ফিরে আসে। কিন্তু ১০ মিনিট পরেই তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন আসে। নীলা চৌধুরী তার প্রোফাইল পিকচারে রিঅ্যাক্ট দিয়েছে।
রোহান কাঁপা কাঁপা হাতে নোটিফিকেশনটা খোলে। হ্যাঁ, তার প্রোফাইল ছবিতে নীলা চৌধুরী নামের সেই প্রোফাইল থেকে একটা ‘ওয়াও’ রিয়েক্ট এসেছে। রোহানের মনে হচ্ছে, কেউ তার সঙ্গে ভয়ংকর কোনো মজা করছে। সে ঠিক করে, প্রোফাইলটাকে ব্লক করে দেবে।
কিন্তু ব্লক করার আগেই তার মেসেঞ্জারে একটা মেসেজ আসে। নীলার প্রোফাইল থেকে। ‘আমাকে ভয় পাচ্ছো?’
রোহানের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। সে কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনটা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ফোনের স্ক্রিনটা তখনো জ্বলছে। একের পর এক মেসেজ আসছে।
-তোমার লাল রঙের টেবিল ল্যাম্পটা খুব সুন্দর।
-জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলে তোমার মুখটা আরও ভালো করে দেখতে পেতাম।
- ভয় পেও না। আমি শুধু দেখছি।
রোহান বুঝতে পারে, এটা সাধারণ কোনো হ্যাকার নয়। এই সত্তাটা তাকে দেখতে পাচ্ছে। এই মুহূর্তে, তার নিজের ঘরে বসে।
সে দৌড়ে গিয়ে ঘরের সব লাইট জ্বালিয়ে দেয়। জানালার পর্দাগুলো টেনে দেয়। ঠিক তখনই, তার টেবিল ল্যাম্পের বাল্বটা মৃদু একটা ‘পপ’ শব্দ করে নিভে যায়। পুরো ঘরটা আবার ম্লান হয়ে যায়।
দেয়ালের ওপাশে বা পর্দার আড়ালে কেউ নেই। যে তাকে দেখছে, সে আছে তার ফোনের ভেতরে, তার ব্যক্তিগত ডিজিটাল জগতে এক রহস্যময় সত্তা হয়ে।
পুরোপুরি আতঙ্কিত হয়ে রোহান ফোনটা হাতে নেয়। সে নীলার প্রোফাইলটা ব্লক করার জন্য শেষ চেষ্টা করে। কিন্তু প্রোফাইলটা লোড হচ্ছে না। শুধু ঘুরছে। স্ক্রিনের মাঝখানে ঘুরতে থাকা লোডিং আইকনটা যেন হঠাৎ একটা অস্পষ্ট চোখের মতো দেখাচ্ছে।
ঠিক তখনই রোহানের ফোনটা নিজে থেকেই রিস্টার্ট হয়। যখন ফোনটা আবার চালু হয়, সবকিছু স্বাভাবিক। মেসেঞ্জারে কোনো মেসেজ নেই, নোটিফিকেশনও নেই। রোহান ফেসবুক খুলে নীলার প্রোফাইলটা সার্চ করে। কিন্তু পাওয়া যায় না।
প্রোফাইলটা উধাও হয়ে গেছে। রোহান হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মনে হচ্ছে যেন একটা দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন শেষ হলো। সে ঠিক করে, আর কোনোদিন ফেসবুক ব্যবহার করবে না। নিজের প্রোফাইলটা ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়ার জন্য সে তার প্রোফাইল পেজে যায়। আর তখনই তার বুকের ভেতর দিয়ে একটা বরফ-শীতল স্রোত বয়ে যায়।
তার নিজের প্রোফাইলের টাইমলাইনে, এইমাত্র একটা নতুন স্ট্যাটাস আপডেট হয়েছে। তার নামেই। কিন্তু স্ট্যাটাসটা সে লেখেনি।
সেখানে লেখা, ‘এখন থেকে সব আলো আমার। এই প্রোফাইলটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। এখান থেকে সবকিছু কী সুন্দর স্পষ্ট দেখা যায়।’
আর স্ট্যাটাসটির নিচে প্রথম কমেন্টটি এসেছে নীলা চৌধুরীর প্রোফাইল থেকে। শুধু একটি ইমোজি- একটা নীল রঙের ‘জলবিন্দু’র ইমোজি।
টেকেরহাট, রাজৈর, মাদারীপুর
তারেক/
.jpg)
.jpg)