আজকের এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ছবি বা গল্প মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার কিলোমিটার পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। কিন্তু যখন সেই আবেগপ্রবণ গল্পটি সত্যতা হারায়, তখন প্রশ্ন জাগে একটি ভুল তথ্য এত দ্রুত এবং এত গভীরভাবে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে। নরওয়ের আপেল বিতরণের একটি ঘটনা সম্প্রতি তারই উদাহরণ স্থাপন করেছে।
যেভাবে ছড়াল নরওয়ের মানবিক প্রথা
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নরওয়ের একজন নারী (ইঙ্গার গারাস) তার বাগানে প্রচুর আপেলের ফলন দেখতে পান। বাগানের ২০০ কেজিরও বেশি অতিরিক্ত আপেল নষ্ট হওয়া থেকে তিনি বাঁচাতে চাইলেন। এত অতিরিক্ত আপেলগুলো নষ্ট হতে না দিয়ে তিনি এক মানবিক কাজ করে বসলেন। আপেলগুলো ছোট ছোট ব্যাগে ভরে নিজের বাড়ির বেড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা করলেন। তার উদ্দেশ্য অভাবী পথচারীরা যেন বিনা দ্বিধায় বিনামূল্যে আপেলগুলো নিতে পারে।
তার এই মহৎ উদ্যোগের ছবিটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়ার পর এই একক উদারতার কাজটি ভুলভাবে প্রচারিত হতে থাকে। ছড়াতে ছড়াতে বিকৃতি ঘটে তথ্যে।
‘নরওয়ের মানুষরা তাদের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে অতিরিক্ত আপেল এভাবে বেড়ার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়, যাতে দরিদ্ররা বিনামূল্যে খেতে পারে’- একটা সময় এই ব্যক্তিগত মহৎ কাজের শিরোনাম এমনটাই হয়ে ওঠে। মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে মানবতার উদাহরণ হিসেবে এটিকে প্রচার করতে থাকে এরপর থেকেই। খুব কম সময়ের মধ্যে এ খবরটি বিশ্বের অসংখ্য গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। যাচাই-বাছাই ছাড়াই একটা ভুল তথ্য এভাবে ছড়িয়ে যায় মানবতার উদাহরণস্বরূপ।
মানুষের সহানুভূতি, খাদ্য অপচয় রোধের প্রতি সমর্থন এবং নিঃস্বার্থ উদারতার এই কাহিনিটি সবাই সানন্দে গ্রহণ করে নেয়। একটি একক মানবিক উদ্যোগ পরিণত হয় ‘দেশব্যাপী প্রথা’ হিসেবে। তবে পরে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং সংস্থা যাচাই করে নিশ্চিত করে যে, এটি নরওয়ের সাধারণ প্রথা নয়, বরং ইঙ্গার গারাসের একটি ব্যতিক্রমী ব্যক্তিগত উদ্যোগ। কিন্তু ততক্ষণে এই ভুল বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। এ ধরনের খবর দ্রুত ছড়ানোর কারণ হিসেবে বলা যায় মানবিকতা এবং উদারতার শক্তিশালী বার্তার স্পর্শ। নরওয়ের আপেল বিতরণের এ ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, জোরালো আবেগ বা ইতিবাচক বার্তা থাকে এমন তথ্য সত্য যাচাইয়ের আগেই কীভাবে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজে একটি আংশিক সত্যকে ভুল তথ্য মিশিয়ে তার একটা অদৃশ্য ভিত্তি স্থাপন করে। এই ঘটনা ডিজিটাল যুগে আমাদের আরও সচেতন হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
তারেক/
.jpg)