বাংলাদেশের প্রকৃতিতে যেসব ছোট্ট পাখি আমাদের মুগ্ধ করে, তাদের মধ্যে ফুলঝুরি অন্যতম। এ পাখিটি তার ক্ষুদ্র আকার, রঙিন পালক এবং চঞ্চল স্বভাবের জন্য সবার কাছে পরিচিত। ফুলের বাগানে এদের দেখা মেলে প্রায়ই, যেখানে তারা ব্যস্ত থাকে মধু সংগ্রহে। এরা নেক্টারিনিডি পরিবারের সদস্য, যে পরিবারের পাখিরা মূলত ফুলের মধু খেয়ে জীবনধারণ করে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের দেখা যায়।
পুরুষ ফুলঝুরির চেহারা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখির সারা শরীর ধাতব বেগুনি-নীল রঙে ঢাকা থাকে, যা সূর্যের আলোতে ঝলমল করে। বুকের মাঝখানে একটি উজ্জ্বল লাল বা বেগুনি রঙের ছোপ থাকে, যা তাদের আরও সুন্দর করে তোলে। তবে প্রজনন মৌসুমের বাইরে পুরুষ পাখিরও রঙ ফিকে হয়ে যায় এবং স্ত্রী পাখির মতো দেখতে লাগে। স্ত্রী ফুলঝুরি তুলনামূলকভাবে সাদামাটা, জলপাই-বাদামি রঙের, যা তাদের নিরাপত্তার জন্য সহায়ক।
উভয় লিঙ্গের পাখিরই ঠোঁট সরু, লম্বা এবং সামান্য বাঁকানো, যা ফুলের গভীর থেকে মধু তুলতে বিশেষভাবে উপযোগী। ফুলঝুরি আকারে অত্যন্ত ছোট। এদের দৈর্ঘ্য মাত্র ৯ থেকে ১০ সেন্টিমিটার এবং ওজন মাত্র ৬ থেকে ৮ গ্রাম। এত ছোট হওয়া সত্ত্বেও এরা অসম্ভব চঞ্চল এবং সক্রিয়। সারা দিন এরা ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ায়, মধু খায় এবং ছোট ছোট পোকামাকড় শিকার করে। ফুলঝুরির ওড়ার ধরন খুবই দ্রুত এবং সরাসরি। কখনো কখনো এরা বাতাসে স্থির থেকে ফুল থেকে মধু খেতে পারে, অনেকটা হামিংবার্ডের মতো।
এ পাখির খাদ্যাভ্যাস বেশ বৈচিত্র্যময়। প্রধান খাদ্য ফুলের মধু হলেও এরা ছোট পোকামাকড়, মাকড়সা এবং পোকার লার্ভাও খায়। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, তাই তখন এরা বেশি পোকামাকড় শিকার করে। জবা, কাঞ্চন, শিমুল, করবী এবং বিভিন্ন বন্য ফুলের মধু এদের বিশেষ পছন্দ। ফুলের পরাগায়ণে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যাওয়ার সময় এদের শরীরে পরাগরেণু লেগে যায়।
ফুলঝুরির বাসস্থান মূলত উন্মুক্ত বনভূমি, বাগান, পার্ক এবং গ্রামীণ এলাকার ঝোপঝাড়। শহরের বাগানেও এদের সহজেই দেখা যায়। বাংলাদেশের সর্বত্রই এরা বাস করে এবং সারা বছরই দেখা মেলে। এরা স্থায়ী বাসিন্দা পাখি, অর্থাৎ মৌসুমভেদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হয় না। বাংলাদেশের পরিবেশে ফুলঝুরির অবস্থান বেশ ভালো। এখনো এরা সুলভ এবং হুমকির সম্মুখীন নয়। তবে বাগান ও বনভূমি কমে যাওয়া এবং কীটনাশকের ব্যবহার এদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফুলের গাছ রোপণ করে এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আমরা এই সুন্দর পাখিটিকে সংরক্ষণে সাহায্য করতে পারি।
তারেক/
.jpg)
.jpg)