চীনের কং পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এমন এক ইতিহাসের ধারা, যা শুধু একটি পরিবারের আভিজাত্যের গল্প নয় বরং চীনা সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে বহন করে চলছে দীর্ঘ ২ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই পরিবারের শিকড় কনফুসিয়াসের (চীনে পরিচিত ‘কং ফুজি’) বংশধর। কনফুসিয়াস ছিলেন নৈতিকতা, শিক্ষা ও মানবতাবাদী দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা, যিনি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার আদর্শ, প্রজ্ঞা ও জীবনদর্শন শুধু চীনেই নয়, সমগ্র পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক রূপ নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে তার রক্তধারার গুরুত্ব সমাজে ছিল প্রবল।
কং পরিবার বসবাস করত মূলত শানডং প্রদেশের কুফু শহরে। ‘কং পরিবার’ বলতে শুধু একটি বংশনাম নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সুপ্রাচীন বংশগৌরবের দীর্ঘ কাহিনি। চীনের ইতিহাসে কোনো পরিবারের বংশতালিকা এতটা সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়নি। ৮০-৯০ প্রজন্মেরও বেশি ধরে তাদের বংশপরম্পরা লিপিবদ্ধ, যা বিশ্বে একটি অনন্য রেকর্ড। তাদের পারিবারিক সংরক্ষণাগারে অতীতের শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ঘিরে বিপুল তথ্যভাণ্ডার রয়েছে।
চীনের সাম্রাজ্য যুগে কং পরিবারের সদস্যরা বিশেষ মর্যাদা পেতেন। অনেক সময় তাদের দেওয়া হতো সরকারি পদ, সাংস্কৃতিক অভিভাবকের মতো বিশেষ উপাধি। বিশেষ করে মিং ও ছিং রাজবংশে কনফুসিয়াসের বংশধরদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান ছিল রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ। তাদের জন্য নির্মিত হয়েছিল বিশাল প্রাসাদ ‘কং ফু’। এই প্রাসাদটি আয়তন ও সৌন্দর্যে অনেক সম্রাটের প্রাসাদের চেয়েও কম নয়। পাশাপাশি কনফুসিয়াসের সমাধি ‘কং লিন’ এবং তার স্মৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা মন্দির ‘কং মিয়াও’ আজ ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত।
কং পরিবারের ক্ষমতা শুধু সাংস্কৃতিক মর্যাদায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তারা ভূমি ও সম্পদের দিক থেকেও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। বহু শতাব্দী ধরে তারা এক অর্থে একটি ক্ষুদ্র সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। তাদের নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বৃহৎ জমিদারি ছিল। ফলে তাদের সামাজিক প্রভাব ছিল দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচ্য বিষয়।
তবে ইতিহাসের পাতা সব সময় সমান নয়। ২০ শতকের শুরুতে চীন বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হলে কং পরিবারের প্রভাব কমতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর তাদের বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় কনফুসিয়াসের দর্শন ও তার অনুসারীদের রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে দেখা হয়, ফলে কং পরিবার নির্যাতন ও অবমাননার শিকার হয়। কুফুর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু সময় বদলে যায়। আজকের চীনে আবার কনফুসিয়াস ও তার আদর্শকে পুনরায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে কং পরিবার নতুনভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছে। তাদের ইতিহাস, দর্শন ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পর্যটনকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিনিময় কর্মসূচি চালু হয়েছে। কং পরিবারের অনেক সদস্য আজও কুফুতে বাস করেন এবং নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেন।
তারেক/
.jpg)
.jpg)