হোক্কাইডোর তুষারভেজা বনভূমিতে শীত নেমে এলে বাতাসে জমে ওঠে এক ধরনের স্ফটিক নীরবতা। সেই নীরবতাকে ভেঙে হঠাৎই যখন উড়ে আসে এক নরম সাদা গোল পাখি, মনে হয় যেন কোনো রূপকথার পরী ভুল করে বাস্তব জগতে ঢুকে পড়েছে। সেই পরীকেই বলে ‘স্নো ফেইরি’। এর বৈজ্ঞানিক নাম Shima Enaga। এটি লং টেইলড টিট পাখির হোক্কাইডো উপপ্রজাতি। তার সৌন্দর্য, আচরণ, কোমলতা সব মিলিয়ে সে যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত জলরং।
স্নো ফেইরির সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অসাধারণ চেহারা। দেহের রং প্রায় পুরোপুরি সাদা। চোখ দুটো কালো, ছোট গোল। মুখমণ্ডল এতটাই গোল ও মোলায়েম যে, দূর থেকে দেখে মনে হয় তুলার গুটির ওপর দুটি চোখ বসানো আছে। তার দেহ ছোট মোট দৈর্ঘ্য ১২ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার। লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭-৯ সেমি, যা দেহের তুলনায় দীর্ঘ। এদের শরীরের অর্ধেকের বেশি জায়গাজুড়ে থাকে লম্বা কালচে লেজ, যেটি তাদের চলার ভঙ্গিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। স্নো ফেইরির ওজন ৬-৯ গ্রাম।
শীতে এই পাখি তার পালক ফুলিয়ে তোলে, ভেতরে বাতাস ধরে রাখে ফলে দেহের চারপাশে তৈরি হয় তাপরোধী এক উষ্ণ আবরণ। এই পালক ফোলানোর অভ্যাস তাদের দেয় সেই অতুলনীয় ‘ফ্লাফি’ সৌন্দর্য, যেটির ছবি দেখলেই মানুষ মুগ্ধ হয়ে যায়। মাত্র কয়েক গ্রাম ওজনের এই ক্ষুদে প্রাণী কীভাবে বরফের দেশে বেঁচে থাকে, তা ভেবেও অবাক হতে হয়।
স্নো ফেইরি ছোট পাখি, তবে বনের বড় পরিশ্রমী শিকারি। এরা মূলত পোকামাকড়ভোজী। গাছের কাণ্ড, ডাল বা পাতার ভাঁজে থাকা ক্ষুদ্র পোকামাকড়, মাইট, লার্ভা সবকিছুই তারা খুঁজে বের করে খায়। তবে শীতকালে যখন পোকা নেই বললেই চলে, তখন তারা খায় বুনো বেরি, শুকনো বীজ, গাছের রস ও ছোট ছোট মাকড়সা। এরা সাধারণত চঞ্চল ও দলবদ্ধভাবে খাবার খোঁজে। হাড় কাঁপানো শীতে তাদের টিকে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি এই নিরলস খাদ্য খোঁজা।
হোক্কাইডোর বরফ ঢাকা বনের বাসিন্দা স্নো ফেইরি মূলত বসবাস করে হোক্কাইডোর উপ-আর্কটিক বনভূমিতে। এরা পছন্দ করে স্যাঁতসেঁতে শীতল জঙ্গল, সাদা বার্চ গাছ, পাইন ও স্প্রুস অরণ্য, তুষারে ঢেকে থাকা নীরব উপত্যকা। তাদের দলবদ্ধ জীবন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণত ৫-২০টি পাখি একসঙ্গে থাকে। বনে এদের ছোট ছোট সাদা মেঘের মতো লাফাতে দেখলে মনে হয় যেন কোনো কার্টুন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
মস আর মাকড়সার সুতায় বোনা স্নো ফেইরির বাসা যেন এক শিল্পকর্ম। বসন্তে এরা জোড়া বাঁধে। তারপর তৈরি করে এক গোলাকার, নরম, তুলতুলে বাসা; যা দেখতে ছোট কাপড়ের থলের মতো। বাসা বানাতে তারা ব্যবহার করে- শুকনো মস, লিচেন, ছোট পাতা, মাকড়সার জাল; যা প্রাকৃতিক আঠার মতো কাজ করে। ভেতরে দেয় পালক, তুলা, পশম। এই বাসা প্রকৃতির নিখুঁত কারুকাজের একটি নিদর্শন। আরও আশ্চর্য বিষয় হলো- একটি দলে থাকা কিছু প্রাপ্তবয়স্ক পাখি মা-বাবার সঙ্গে মিলে বাচ্চাদের খাবার জোগায়। অর্থাৎ এদের মধ্যে সমষ্টিগত পরিবারব্যবস্থা আছে।
ছোট শরীর, বড় সামাজিকতা, সারাক্ষণ লাফালাফি, উড়াউড়ি, দলবদ্ধভাবে খাবার সংগ্রহ, ঠাণ্ডায় রাতে একসঙ্গে গাদাগাদি করে ঘুমানো, তীক্ষ্ণ ও নরম ডাক ‘চি-চিরির’ হোক্কাইডোর বনের নীরবতায় যেন এক ধরনের স্নিগ্ধ সংগীত।
স্নো ফেইরি শুধু পাখি নয়, এটি হোক্কাইডোর একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। খেলনা, নোটবুক, ক্যালেন্ডার, পোস্টকার্ড, স্টিকার- সব জায়গায় এই ক্ষুদে পাখির ছবি পাওয়া যায়। পর্যটকরা শীতকালে বনে ভিড় করে শুধু এই পাখিদের এক ঝলক দেখার জন্য। বর্তমানে পাখিটি বিপন্ন নয়, তবে সতর্কতার প্রয়োজন। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল হারানো, এগুলো ভবিষ্যতে পাখিটির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বরফের সাদা পৃথিবীতে চারপাশে যখন তুষার ঝরছে, আর স্নো ফেইরি ডালে বসে গোল হয়ে ফুলে উঠছে তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের হাতে একটি পরী এঁকে দিয়েছে। এই পাখি শুধুই প্রাণী নয়; সে শীতের নীরবতার মাঝখানে জন্ম নেওয়া এক রহস্যময় কবিতা।
হোক্কাইডোর স্নো ফেইরি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ছুঁয়ে থাকা এক জীবন্ত বিস্ময়।
তারেক/
.jpg)
.jpg)