মরুভূমির বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা। যতদূর চোখ যায়, নেই কোনো সবুজের ছোঁয়া। তপ্ত বালুর ওপর শুয়ে আছে মরিচাধরা এক লোহার দৈত্য! নিঃশব্দ, জীর্ণশীর্ণ, তবুও অমর ইতিহাস বুকে নিয়ে। তবে তা সাধারণ ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে সংঘটিত আরব বিদ্রোহের অন্যতম জীবন্ত স্মারক; উসমানীয় সাম্রাজ্যের রেল ইঞ্জিন।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯১৬-১৯১৮ সালের আরব বিদ্রোহের সময় আরব বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর বিশেষ কর্মকর্তা টি ই লরেন্স, যিনি ইতিহাসে ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ নামে খ্যাত। তার কৌশলগত পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা। সেই সময় মক্কা থেকে মদিনা পর্যন্ত বিস্তৃত হিজাজ রেলপথ ছিল উসমানীয়দের সামরিক বাহিনীর প্রাণশক্তি। এই রেলপথ ধ্বংস করতে পারলে উসমানীয় সেনাদের রসদ, অস্ত্রশস্ত্র ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত।
আরব বিপ্লবীরা বারবার সাহসী হামলা চালিয়েছিলেন এই রেললাইন ও ট্রেনের ওপর। ডিনামাইটের বিস্ফোরণে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছিল বহু ইঞ্জিন ও বগি। ছবিতে দেখা এই ট্রেনটির অংশটুকু সেই হামলারই নিদর্শন। একসময় যার বুকে যুদ্ধের গোলাবারুদ, সেনা আর কোলাহল ছিল, আজ তা নিঃশব্দে শুয়ে আছে মরুভূমির বুকে, সাক্ষী হয়ে আছে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত যুগের।
প্রচণ্ড রোদে পুড়ে যাওয়া এই লোহার অবশেষ দেখে মনে হয়, যেন সময়ের স্রোতেও ইতিহাস মুছে যায়নি, বরং ধীরে ধীরে সে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রবল বালুঝড়ে ঢেকে যায়, আবার শুষ্ক বাতাসে বালু সরে গিয়ে উন্মোচিত হয় তার কঙ্কাল। মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা দূরবর্তী পুরোনো ভবনগুলো বলে দেয়; এখানে একদিন ছিল জনবসতি, ছিল সামরিক গতিশীলতা, ছিল বাণিজ্যের পথ।
এই হিজাজ রেলপথ শুধু যুদ্ধের গল্পই বহন করে না; এটি মুসলিম বিশ্বের জন্যও গভীর ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রেলপথটির মূল উদ্দেশ্য ছিল হজযাত্রীদের মক্কা-মদিনা যাতায়াতে সুবিধা দেওয়া। কালের পরিক্রমায় সেই মানবিক উদ্যোগ পরিণত হয়েছিল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে, আর সেটাই একসময় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল এই রেললাইনকে।
আজ সেই রেলপথের বুকে অবশিষ্ট পড়ে থাকা বগি আর ইঞ্জিনগুলো ইতিহাসের প্রত্নসম্পদে পরিণত হয়েছে। পর্যটকরা এসে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে এই মরিচা পড়া লোহার টুকরোগুলোর দিকে। তারা যখন ছবিগুলো ক্যামেরায় বন্দি করে নিয়ে যায়, তখন যেন ইতিহাসের প্রতিটি দাগ আবার জেগে ওঠে। যুদ্ধের নির্মমতা, মানুষের সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা; সবই যেন এই ধ্বংসস্তূপে লুকিয়ে আছে।
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)