একটা সময় গ্রামের কিছু খাদক ছিলেন যারা কয়েক কেজি চালের ভাত খেয়ে সাবাড় করে দিতে পারতেন। সেই সময়ে মানুষ ঘরের চালের ভাত খেত। কোনো হিসাব ছিল না খাবারের। নদী-খাল-বিল থেকে মাছ ধরে খেত। জনসংখ্যা ছিল কম। নদ-নদীতে সে তুলনায় মাছ ছিল অনেক বেশি। তাই ঘরে কোনো খাদক থাকলেও তাতে সংসারে খরচের ওপর তেমন প্রভাব পড়ত না। এমনই নীল খাঁ এবং নেইল খাঁ নামের যমজ ভাই ছিলেন বড় মাপের খাদক। তারা কয়েক কেজি চালের ভাত খেতেন।
একবার ফাসিয়াতল হাটে ব্যাপারীরা নৌকা বোঝাই করে কাঁঠাল নিয়ে এসেছেন বিক্রি করতে। হাটের চারদিকে তখন সারি সারি নৌকাবোঝাই করা থাকত মালপত্রে। ঘাটে সব সময় একটা সরগরম ভাব বিরাজ করত। কুমারদের হরেক রকম মাটির জিনিস, ধানবোঝাই নৌকা, কাঁঠাল মৌসুমে হাটের কাছে নদীপাড় জুড়ে কাঁঠালের ঘ্রাণে ম-ম করত। এমন সময় যমজ দুই ভাইয়ের এক ভাই এসেছেন কাঁঠাল কিনতে। তখন সবচেয়ে বড় কাঁঠালের দাম ছিল পাঁচ টাকা। নীল খাঁ একটা বিশাল সাইজের কাঁঠাল নিয়ে ব্যাপারীকে বলল, এটার দাম কত দিতে হবে। ব্যাপারী দাম হাঁকাল পাঁচ টাকা। এ কথা শুনেই নীল খাঁ বলে বসলেন, এই ছোট কাঁঠাল তো আমি একাই খেয়ে ফেলতে পারি। এটার দাম পাঁচ টাকা হয় কী করে? ব্যাপারী নীল খাঁর কথা শুনেই তার মাথা গরম হয়ে গেল। কী বলে এ ব্যাটা। এত বড় কাঁঠাল নাকি সে একা খেতে পারবে। তখন ব্যাপারী রাগের মাথায় বলে বসল, আপনি একা খেতে পারলে আরেকটি কাঁঠাল আপনাকে ফ্রি দেওয়া হবে। শুনে নীল খাঁ বললেন, তবে আমি যে কাঁঠাল খাব, অর্ধেক খাওয়ার পর হাটজুড়ে একটা চক্কর দেব। ব্যাপারী তখন বলল, আপনার যত চক্কর খাওয়ার খাবেন তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু পুরো কাঁঠাল সাবাড় করতে হবে। এ কথা শুনেই নীল খাঁ কাঁঠালটা ধরেই ভেঙে খাওয়া শুরু করলেন। বিশাল কাঁঠাল। ফাসিয়াতলা হাট বসে সপ্তাহে দুবার। রবিবার হাটে হাজার হাজার মানুষ আসে সদাই-পাতি কিনতে। কেউ আসে আবার বিক্রি করতে। এদিকে নীল খাঁর কাঁঠাল খাওয়ার কথা শুনে নদীপাড়ে বিশাল মানুষের জটলা বাড়তে লাগল। একদিকে চলছে কাঁঠাল খাওয়ার দৃশ্য। অন্যদিকে সূর্য আস্তে আস্তে ভাটির দিকে যেতে লাগল। মানুষ বেচাকেনা বন্ধ করে নীল খাঁর কাঁঠাল খাওয়া দেখতে লাগল। ইতোমধ্যেই নীল খাঁর কাঁঠাল খাওয়ার ঘটনাটি পুরো হাটে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে লোকে লোকারণ্য হলো হাটের নদী পাড় এলাকা। বিশাল কাঁঠাল দুই ঘণ্টা সময় ধরে খেয়ে প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন নীল খাঁ। আর সামান্য কয়েক কোষ খাওয়া বাকি আছে। এখন তিনি আর খেতে পারছেন না।
এবার ব্যাপারীর সঙ্গে তার কথা মতো, সে পুরো হাটে একবার চক্কর খাবেন। চক্কর খেয়ে আবার বসবেন কাঁঠাল খেতে। এদিকে তার যমজ ভাই নেইল খাঁ হাটের অন্যপ্রান্তে বসে অপেক্ষা করছেন, কখন তার ভাই আসবেন এবং বাকি কাঁঠালটুকু সে সাবাড় করবেন। নীল খাঁ চক্কর খেতে এসে তার ভাই নেইল খাঁকে পাঠিয়ে দিল বাকি কাঁঠাল সাবাড় করতে। আর বলে দিল, কাঁঠাল খেয়ে আরেকটি কাঁঠাল বিনা মূল্যে হাতে করে নিয়ে আসতে। যমজ দুই ভাইয়ের চেহারা একই রকম দেখতে। পোশাক-আশাকও একই। তাই কেউ সহজে তাদের ঠাহর করতে পারল না। চক্কর খেতে এসে নীল খাঁ তার ভাই নেইল খাঁকে পাঠিয়েছেন বাকি কাঁঠাল খেতে। নেইল খাঁ তার ভাইয়ের বাকি কাঁঠালটুকু সাবাড় করে দিয়ে ব্যাপারীর কাছ আরেকটি বড় কাঁঠাল হাদিয়া স্বরূপ নিয়ে আসলেন। কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না। এমনকি, হাটের যারা তাদের চিনেন তারা পর্যন্ত নেইল খাঁকে চিনতে পারলেন না। এভাবেই একেক হাটে একেক জিনিস খাওয়ার প্রতিযোগিতা তাদের চলতে থাকে। এটা তাদের একটা আনন্দের বিষয় হয়েও দাঁড়িয়েছিল।
ফাসিয়াতলা হাটে আরেকদিন নীল খাঁ আর নেইল খাঁ দুই ভাই বিশাল বড় একটি কাসার পাত্রে এক ব্যাপারীকে দেখে নদী থেকে খাবার পানি উঠাচ্ছেন। এ পাত্রে করে ব্যাপারীরা একবার নদী থেকে পানি উঠালে ১০-১২ জন খেতে পারেন। তখনকার সময়ে টিউবওয়েল ছিল না। মানুষ নদীর পানি উত্তোলন করে তাতে ফিটকিরি দিয়ে রেখে তারপর তা পান করতেন। আর পানি ছিল টলটলে পরিষ্কার। এবার ব্যাপারীর পানির পাত্র দেখে নীল খাঁ বলল, এ সামান্য পানি ক’জনে খাবে? ব্যাপারী বলল, আমরা ১০ জন। বলো কী? এ পানি তো আমি একাই খেয়ে ফেলতে পারি। এ কথা শুনে ব্যাপারী বলল, আপনি পারলে খেয়ে দেখান। তখন নীল খাঁ বলল, আমি খেতে পারলে এ পাত্রটি কিন্তু আমি নিয়ে যাব। আর না খেতে পারলে আপনাকে একটা নতুন কিনে দেব। ব্যাপারী ভাবল এত পানি কিছুতেই সে খেতে পারবে না। তাই সে রাজি হয়ে গেল। তখনই নীল খাঁ তার তেলেসমাতির কথাটি বলে বসল। তবে আমি অর্ধেক পানি খেয়ে হাটে একটা চক্কর দেব। তারপর বাকি পানি খাব। এতে ব্যাপারী রাজি হলো। নীল খাঁ এক চুমুকেই অর্ধেক পানি সাবাড় করে হাট দিয়ে একটা চক্কর খেতে গেলেন। তারপর পুরো হাট ঘুরে তার ভাইকে খুঁজে বের করে বললেন, নদী পাড়ে কাসার পাত্রে অর্ধেক পানি খেয়ে বাকি অর্ধেক রেখে এসেছি। পানিটুকু খেয়ে পাত্রটি নিয়ে আসো। যে ভাবা সেই কাজ। কাঁঠাল খাওয়ার মতো করেই যমজ নেইল খাঁ তার ভাইয়ের বাকি পানি খেয়ে এসে কাসার পাত্রটি সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। এভাবে কত হাটের কত দোকানের মিষ্টি যে দুই ভাই সাবাড় করেছেন তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
এ গল্পটি আমি আমার বাবার মুখে শুনেছিলাম। কিন্তু বিশদভাবে তখন জানতে পারিনি। এবার গ্রামের বাড়িতে টানা ১৫ দিন কাটিয়ে এসে নীল খাঁ ও নেইল খাঁর ঘটনাটি একজন ৯০ বছরের হুসেন হাওলাদারের কাছে শুনলাম। এ ঘটনাটি এখনো বয়স্কদের মুখে মুখে গল্প আকারে শোভা পায়। তারা একটু ফুরসত পেলেই নীল খাঁ আর নেইল খাঁর গল্পটি বলে থাকেন। একটা সময় নদীপাড়ের এ হাটই ছিল মানুষের বেচাকেনার অন্যতম মাধ্যম। তাই বিশাল জনগোষ্ঠী আসত হাটে। এখন আর সে সুদিন নেই। বাড়ির পাশে অনেক দোকান হয়ে যাওয়ায় হাটের সেই জৌলুসতা অনেক কমে গেছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখন আর কেউ ফাসিয়াতলা হাটে আসেন না। নেই সুনিল ঘোষের বিখ্যাত মিষ্টি দোকান এখন আর নেই। যেখানে বড় সাইজের একটা রসমালাই বাবা কিনে দিতেন দুই টাকায়। যার দাম এখন বেড়ে ৩০ টাকা হয়েছে।
হাটে নেই এখন আর নীল খাঁ আর নেইল খাঁ। কিন্তু তাদের মজার ঘটনাগুলো এখন মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। আলেপ সরদার এক মাইল দূর থেকে হাটে আসা তার ভাইদের ডাক দিলে তার গলা শুনতে পেতেন। কী ছিল তখনকার মানুষের গলার আওয়াজ। আলেপ সরদার কয়েক কেজি চালের ভাত খেতে পারতেন অনায়াসে। আর তার গলার আওয়াজ ছিল মাইকের মতো। হাটের অলিগলিতে ঘুরলে এখনো সে দরাজকণ্ঠের ইতিহাস শোনা যায়।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)