১৮৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি কারাগারে পকেটমারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মারা যান ‘স্টোনম্যান উইলি’ নামের একজন ব্যক্তি। দুর্ঘটনাক্রমে যার লাম মমি করে ফেলা হয়েছিল। তার আসল পরিচয় অনেকদিন পর্যন্ত জানা যায়নি, কারণ তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তিনি কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা নাম বলেছিলেন।
পুরোনো নথি থেকে জানা যায় সে তার পরিবারের লজ্জা থেকে বাঁচতে ‘জেমস পেন’ নাম দিয়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন যে নামটি ভুয়া ছিল। কিন্তু ৩৭ বছর বয়সে কিডনি বিকল হয়ে মারা যাওয়ার আগেও তিনি তার আসল পরিচয় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। পরিবারের কেউ তার লাশ দাবি না করায় বা নিতে না আসায়, তার লাশ তখন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার রিডিংয়ের থিও সি. আউমানের ফিউনারেল হোমে রাখা হয়,যা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রহস্যময় মমিতে পরিণত হয়েছিল।
পেনসিলভানিয়ার শহর রিডিংয়ে অবস্থিত ফিউনারেল হোমে একজন লাশ প্রস্তুতকারী দুর্ঘটনাক্রমে তাকে মমি করে ফেলেন, যিনি নতুন শ্বসন কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলেন। উনিশ শতকের দিকেও লাশকে মমি করার প্রচলন ছিল। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরিচালক থিও আউমান তখনকার দিনে ব্যবহৃত কৌশল ব্যবহার করে অজান্তেই প্রাকৃতিক মমিকরণের এক অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় আর্দ্রতা দূর হয়ে যায় এবং ত্বক এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংরক্ষণ করা হয় যে, লাশটি শক্ত হয়ে চামড়ার মতো হয়ে যায়। তার চুল এবং দাঁত অক্ষত ছিল, যা তার মমিকে আরও গভীর রহস্যময় করে তোলে।
মমি হয়ে যাওয়ায় তার লাশকে তখন আর সমাহিত করা হয়নি। বরং স্যুট এবং বো টাই পরিহিত স্টোনম্যান উইলিকে একটি কফিনে রেখে প্রদর্শন করা হয়। তার চুল এবং দাঁত অক্ষত ছিল এবং তার ত্বক সতেজ চামড়ার মতো ছিল। স্কুলছাত্র, পর্যটক এবং দর্শনার্থীসহ সবাই এই সংরক্ষিত মমির কফিন দেখতে আসেন কৌতূহলী মনে। স্থানীয়রা রসিকতা করেছিল যে, উইলি তাদের সবার চেয়েও বেশি বেঁচে ছিলেন। উইলিকে নিয়ে কল্পকাহিনিরও প্রচলন হয়। তাকে নিয়ে রহস্য ও লোককথা ছিল মানুষের মুখে মুখে। এমনকি স্টোনম্যান উইলিকে ‘আমাদের বন্ধু উইলি’ বলেও ডাকা হতো।
কয়েক দশক ধরে উইলির গল্পগুলো সত্য এবং লোককথার কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়েছে। উইলির কফিনটি রাস্তার ধারে এক অদ্ভুত জিনিসে পরিণত হয়েছিল, যেখানে দর্শনার্থীরা ছবি তুলে লোকটির জীবন ও মৃত্যু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করত। তার সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল, কেবল এটুকুই জানা যায় তিনি জেলে মারা গিয়েছিলেন এবং প্রায় দুর্ঘটনাক্রমে মমি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় পরে পুলিশকে ভুল নাম বলা উইলির আসল পরিচয় খুঁজে পায় স্থানীয়রা। তারপরই তাকে সমাহিত করা হয়। ২০২৩ সালে ওই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া গৃহের পরিচালক কাইল ব্ল্যাঙ্কেনবিলার এবং স্থানীয় ইতিহাসবিদরা অবশেষে সূক্ষ্ম আর্কাইভাল গবেষণার মাধ্যমে লোকটির আসল পরিচয় খুঁজে পায়। তারা প্রমাণ করেন যে, ‘উইলি’ আসলে জেমস মারফি ছিলেন। যে কিনা একজন আইরিশ বংশোদ্ভূত ব্যক্তি, যিনি মারা যাওয়ার সময় রিডিংয়ে অগ্নিনির্বাপকদের একটি সম্মেলনে ছিলেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে রিডিং শহরের ২৭৫তম বার্ষিকী উদযাপনের মধ্যে আয়োজিত একটি সমাধি অনুষ্ঠানে মারফির দেহাবশেষ অবশেষে ফরেস্ট হিলস মেমোরিয়াল পার্কে সমাহিত করা হয়। তার আসল নামটি একটি সমাধিফলকে খোদাই করা হয়।
শেষকৃত্যের জন্য শহরের বাসিন্দা এবং দর্শনার্থীরা জড়ো হয়েছিলেন। উইলির গল্পটি শেষ হতে দেখে কেউ কেউ আবেগপ্রবণ হয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ স্থানীয় ইতিহাসের এমন অস্বাভাবিক অংশ প্রত্যক্ষ করার জন্য বিস্মিত হয়েছিলেন।
উইলি কিংবা জেমস মারফি ইতিহাসের এক রহস্যময় চরিত্র হয়ে আছে এখনো।
তারেক/
.jpg)