সাধারণ পুলিশের গাড়ি বলতে আমাদের চোখে ভাসে ধুলোমাখা জিপ বা সাইরেন লাগানো সেডান। কিন্তু দুবাই পুলিশের গাড়ির বহরের কথা শুনলে সেই ধারণা এমনভাবে উড়ে যায়, যেন মরুভূমির বালুর ওপর দিয়ে হঠাৎ সুপার কারের টায়ার চলে গেল! এখানে পুলিশের কাজ শুধু অপরাধ দমন নয়, শহরের ইমেজ ধরে রাখা; আর সেই ইমেজ যে কতটা চকচকে, তা বোঝা যায় তাদের গাড়ির দিকে তাকালেই।
ভাবুন তো, ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। হঠাৎ পাশ দিয়ে গর্জন করতে করতে চলে গেল ল্যাম্বরগিনি অ্যাভেন্টাডর, গায়ে সবুজ-সাদা পুলিশ লিভারি। প্রথমে মনে হবে, নিশ্চয়ই কোনো ধনী ইউটিউবার ভিডিও শুট করছে। তারপর চোখ পড়বে দরজায় লেখা ‘Dubai Police’। তখনই মাথায় প্রশ্ন আসবে, ‘এটা কি সত্যি, নাকি মরুভূমির মরীচিকা?’ দুবাই পুলিশের ক্ষেত্রে উত্তরটা- একদম সত্যি।
এই পুলিশ বাহিনীর বহরে আছে ল্যাম্বরগিনি, ফেরারি, বুগাটি, বেন্টলি, ম্যাকলারেন; যেন গাড়ির কোনো আন্তর্জাতিক অটো শো! বুগাটি ভেয়রন, যার গতি ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি ছুঁতে পারে, সেটিও পুলিশের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও সত্যি বলতে, এই গাড়িগুলো দিয়ে তারা নিয়মিত অপরাধী ধাওয়া করে না। কারণ, অপরাধী ধরতে বুগাটির দরকার পড়ে বিশ্বে এমন শহর খুব কমই আছে। কিন্তু ইমেজ; ওই যে বললাম ইমেজটাই আসল।
দুবাই পুলিশ খুব ভালো করেই জানে, তাদের শহর মানে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, এটা একটা ব্র্যান্ড। বিশ্বের ধনী পর্যটক, ব্যবসায়ী আর সেলিব্রিটিদের কাছে দুবাই মানে বিলাসিতা, আধুনিকতা আর একটু বেশি কিছু। সেই ‘একটু বেশি’ অংশটাই তারা এনে দেয় পুলিশের গাড়ির বহরে। ফলে পর্যটকরা যখন ছবি তোলে, তখন পুলিশের গাড়িও হয়ে ওঠে ট্যুরিস্ট স্পট। চোর ধরার পাশাপাশি পুলিশ এখানে ইনস্টাগ্রাম রিলের নায়কও বটে।
মজার বিষয় হলো, এই সুপারকারগুলো দিয়ে সাধারণ টহল দেওয়া হয় না। এগুলো মূলত ব্যবহার করা হয় বিশেষ এলাকায়; বুর্জ খলিফা, জুমেইরা বিচ, বড় বড় শপিং মল বা আন্তর্জাতিক ইভেন্টে। মানে যেখানে ক্যামেরা বেশি, সেখানে গাড়িও বেশি চকচকে। এতে একদিকে অপরাধীদের মনে একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়- ‘এই শহরে কিছু করলেই চোখে পড়বে।’ অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি হয় আধুনিক আর বন্ধুসুলভ।
কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, ‘এত দামি গাড়ি কিনে কি পুলিশের টাকা নষ্ট হচ্ছে?’ দুবাই পুলিশ কিন্তু এই প্রশ্নেরও জবাব দেয়। তাদের মতে, এসব গাড়ির বেশির ভাগই উপহার হিসেবে বা বিশেষ সহযোগিতার মাধ্যমে পাওয়া। আবার অনেক সময় এগুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রচারের অংশ। এক ধরনের লাইভ মার্কেটিং বলা যায় যেখানে আইনশৃঙ্খলা আর বিলাসিতা হাত ধরাধরি করে হাঁটে।
আরেকটা মজার দিক হলো, এই গাড়িগুলো চালানোর জন্য পুলিশ সদস্যদের বিশেষ ট্রেনিং দেওয়া হয়। কারণ, ল্যাম্বরগিনি চালানো আর সাধারণ প্যাট্রোল কার চালানো এক জিনিস নয়। এখানে শুধু গতি নয়, নিয়ন্ত্রণ, দায়িত্ব আর শো-ম্যানশিপ; সবকিছুর মিশেল লাগে। বলতে গেলে, দুবাই পুলিশের কিছু সদস্য একই সঙ্গে অফিসার আর মোটরস্পোর্টস অ্যাম্বাসেডর।
সবশেষে বলা যায়, দুবাই পুলিশের গাড়ির বহর আসলে একটা বার্তা দেয়। বার্তাটা হলো—আইন এখানে কঠোর, কিন্তু উপস্থাপনটা স্টাইলিশ। এখানে পুলিশ মানে শুধু ভয় নয়, বরং কৌতূহল আর বিস্ময়ও। তাই দুবাইয়ে যদি কখনো ট্রাফিক আইন ভাঙতে ইচ্ছে করে, আগে একবার ভাবুন; পেছনে যদি বেন্টলি পুলিশ গাড়ি এসে দাঁড়ায়, তখন কিন্তু অজুহাত দেওয়ার সুযোগ কম। কারণ, এমন গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভুল স্বীকার করাটাও যে একটু বেশি লজ্জার!
তারেক/
.jpg)
.jpg)