পাহাড়ি বনের ভেজা মাটিতে পা ফেললেই যে নীরবতা নেমে আসে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অপূর্ব বিস্ময়। হঠাৎ ঝোপের ফাঁক গলে একটি পাখি বেরিয়ে এলে মনে হয় প্রকৃতি যেন নিজের সবচেয়ে যত্নের রংগুলো এক সঙ্গে মেখে দিয়েছে। সেই পাখিটির নাম টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান (Temminck’s Tragopan)। ফেজান্ট পরিবারের এই দুর্লভ সদস্যটি উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি বনভূমির এক অনন্য অলংকার।
ডাচ প্রাণিবিদ কুনরাড জ্যাকব টেমিঙ্ক-এর সম্মানে এই পাখির নামকরণ করা হয়। ‘ট্র্যাগোপান’ শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে। মূলত প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখির অদ্ভুত ও বর্ণিল চেহারার কারণেই এমন নাম।
টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান দেখতে মাঝারি আকারের, কিন্তু রঙেঢঙে রাজকীয়। পুরুষ পাখিটির লালচে কমলা দেহের ওপর অসংখ্য সাদা দাগ রয়েছে। এর কালচে ডানা, কালো মাথা ও উজ্জ্বল নীল মুখ- যে কারও হৃদয় কেড়ে নেবে মুহূর্তেই। প্রজননকালে এর মুখ ও গলার চামড়ার রঙিন ভাঁজ (wattle ও horn) ফুলের পাপড়ির মতো খুলে যায়।
অন্যদিকে স্ত্রী পাখিটি তুলনামূলকভাবে বাদামি ও ধূসর রঙের। শরীরে রয়েছে কালচে দাগ। এই অনুজ্জ্বল রংই তাকে বনভূমিতে শত্রুর চোখ থেকে আড়াল করে রাখে।
টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান পাখির প্রকৃত বাড়ি পাহাড়ি বন। এদের দেখা যায় উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি অঞ্চল, হিমালয়ের পাদদেশ, মায়ানমার ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বনাঞ্চলে। সাধারণত ১,৮০০ থেকে ৩,৬০০ মিটার উচ্চতায় ঘন, আর্দ্র ও শীতল অরণ্যে এরা বসবাস করে। বাঁশঝাড়, চিরসবুজ বন ও ঝোপঝাড় এদের বিশেষ প্রিয়।
টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান মূলত সর্বভুক, তবে উদ্ভিদজাত খাদ্যই বেশি গ্রহণ করে। খাদ্যের তালিকায় রয়েছে- বুনো ফল ও বেরি, কচি পাতা ও কুঁড়ি, বীজ ও শিকড়, পোকামাকড়, কেঁচো ও ছোট অমেরুদণ্ডী প্রাণী। এরা সাধারণত ভোর ও সন্ধ্যায় খাবার খুঁজতে বের হয়।
এই পাখি অত্যন্ত লাজুক ও নিভৃতচারী। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দ্রুত ঝোপে বা গাছের আড়ালে সরে যায়। বেশির ভাগ সময় মাটিতে হেঁটে চলে। প্রয়োজনে স্বল্প দূরত্বে উড়তে পারে। এদের সাধারণত একা বা জোড়ায় দেখা যায়। নিঃশব্দে চলাফেরা করাই এদের স্বভাব।
প্রজনন মৌসুম এলেই পুরুষ ট্র্যাগোপান যেন রঙিন অভিনেতায় পরিণত হয়। মুখ ও গলার রঙিন ভাঁজ মেলে ধরে, বিশেষ নৃত্য ও ভঙ্গিতে স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ করে। স্ত্রী পাখি সাধারণত গাছের ডালে বা ঘন ঝোপে বাসা বাঁধে। একবারে ৩-৫টি ডিম পাড়ে এবং প্রায় এক মাস ধরে ডিমে তা দেয়। ছানারা জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে চলাফেরা করতে শেখে।
টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান পাহাড়ি বনবাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বীজ ছড়িয়ে বন পুনর্জন্মে সহায়তা করে, পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে। এই পাখির উপস্থিতি মানেই বন এখনো সুস্থ ও জীবন্ত।
বন উজাড় ও পাহাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার ও যথাযথ সংরক্ষণ না হলে ভবিষ্যতে টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান পাখি বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
এই পাখি পাহাড়ি অরণ্যের সৌন্দর্য, নীরবতা ও জীববৈচিত্র্যের প্রতীক। টেমিঙ্কের ট্র্যাগোপান পাখির রঙিন উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা মানেই এমন অমূল্য প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা করা। পাহাড়ের বন বাঁচলে, বাঁচবে এই রঙিন অতিথি।
তারেক/
.jpg)