কথায় আছে, মায়ের মতো আপন কেহ নাই। পৃথিবীতে একমাত্র মা-ই তার সন্তানকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে। নিজের সবটা উজাড় করে দেয় সন্তানের মঙ্গলের জন্য। প্রকৃতির এ বিস্ময়কর জগতে মাতৃত্বের সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে স্পর্শকাতর উদাহরণগুলোর একটি হলো পেলিকান পাখি, বাংলায় যাকে বলা হয় গগনবেড়। এই বিশালাকৃতির পাখিটি কেবল তার দৈহিক গঠন বা দলবদ্ধ জীবনযাপনের জন্য নয়, বরং সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের সমাজে বিখ্যাত হয়ে আছে। খাদ্যসংকটের মুহূর্তে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখে পেলিকান। যা মানবসভ্যতাকে বিস্মিত ও আবেগাক্রান্ত করে।
পেলিকানের সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অঙ্গ হলো এর ঠোঁট। লম্বা ও শক্ত ঠোঁটের নিচের ঠোটের সঙ্গে রয়েছে একটি বড় থলি, যা প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি। এই থলিতে প্রায় ১১ লিটার পানি অথবা ৩০ পাউন্ড মাছ ধরে রাখতে পারে পেলিকান। শুধু নিজের খাদ্য সংরক্ষণই নয়, বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য এই থলিতে প্রায় ৪ কেজি পর্যন্ত মাছ জমা রাখতে সক্ষম। মাছ শিকার করে সেই মাছ প্রথমে থলিতে জমা করে, পরে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে বাচ্চাদের খাওয়ায় মা পেলিকান। এই থলিই যেন তার মাতৃত্বের আধার।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, পেলিকানের কোনো নাক নেই। তারা ঠোঁট দিয়েই শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ সম্পন্ন করে। পানিতে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করার সময় এই শারীরিক গঠন তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়। শক্তিশালী দেহ আর সুবিশাল ডানা নিয়ে পেলিকান অনায়াসে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। একটি পূর্ণবয়স্ক পেলিকানের ওজন সাধারণত ১৩ কেজির বেশি হয়ে থাকে, যা তাকে বিশ্বের ভারী উড়ন্ত পাখিদের তালিকায় স্থান দিয়েছে।
পেলিকান সামাজিক পাখি। তারা একাকী থাকতে পছন্দ করে না; বরং দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। একটি দলে কয়েক হাজার পেলিকান একসঙ্গে থাকে। এই দলগত জীবন তাদের নিরাপত্তা ও খাদ্য সংগ্রহ, দুটোতেই সহায়ক। দলবদ্ধভাবে মাছ শিকার করা তাদের অন্যতম কৌশল, যেখানে সবাই মিলে পানির মাছকে একদিকে তাড়িয়ে এনে সহজে শিকার করে।
প্রজননের সময় পেলিকান পাখির মাতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি মা পেলিকান সাধারণত একবারে তিন থেকে চারটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটতে সময় লাগে প্রায় ২৯ থেকে ৩৬ দিন। বাচ্চা ফুটে বেরোনোর পরই গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের ওপর। জন্মের পর বাচ্চা পেলিকান পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকে বাবা-মায়ের যত্নের ওপর। দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তারা ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী হয়, যদিও পুরোপুরি প্রাপ্তবয়স্ক হতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগে।
তবে পেলিকানকে অমর করে রেখেছে তার আত্মত্যাগের কাহিনি। খাদ্যসংকটের সময়, যখন চারপাশে মাছ পাওয়া যায় না, তখন মা পেলিকান এমন এক সিদ্ধান্ত নেয় যা মানবজাতিকে কাঁদাতে বাধ্য করে। খাদ্যসংকটের সময় মা পেলিকান নিজের ঠোঁট দিয়ে নিজের বুক ছিদ্র করে, সেখান থেকে বের হওয়া রক্ত বাচ্চাদের খাইয়ে দেয়। যেন তার সন্তানরা বেঁচে থাকে। এটি শুধু শারীরিক যন্ত্রণার গল্প নয়; এটি সন্তানের প্রতি মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
এ কারণেই মধ্যযুগে পেলিকানকে আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। ইউরোপের বহু শিল্পকর্ম, চার্চের ভাস্কর্য ও ধর্মীয় চিত্রে পেলিকানকে সন্তানদের জন্য নিজের বুক বিদীর্ণ করে রক্ত পান করানো অবস্থায় আঁকা হয়েছে। এটি মানবজাতিকে ত্যাগ, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়ার এক প্রতীকী ভাষাও বটে।
পেলিকান পাখির আয়ুষ্কাল সাধারণত ১৬ থেকে ২৩ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। দীর্ঘ জীবনে তারা বহু প্রজন্মের সন্তান প্রতিপালন করে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে আজ আর এই মহান মাতৃত্বের প্রতীক পাখিটিকে দেখা যায় না। যদিও প্রায় ৪০ বছর আগে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন নদীবিধৌত অঞ্চলে পেলিকানের উপস্থিতি ছিল। নদী, হাওড় ও জলাভূমি ধ্বংস, খাদ্যসংকট এবং পরিবেশদূষণের ফলে আজ তারা আমাদের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে।
পেলিকান বা গগনবেড় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাতৃত্ব মানে কেবল জন্ম দেওয়া নয়, বরং সন্তানের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা। প্রকৃতির এই নিঃশব্দ শিক্ষাগুলো যদি আমরা বুঝতে পারি, তবে হয়তো মানবসভ্যতা আরও মানবিক হয়ে উঠত।
তারেক/
.jpg)
.jpg)