দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতো শিক্ষার্থীদের মাঝেও দেখা যাচ্ছে আগ্রহ, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের মিশ্র প্রতিফলন। তবে এবারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণদের ভোট বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। আসন্ন নির্বাচন, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, টালমাটাল পরিস্থিতি, নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ এসব বিষয়াদি নিয়ে কী ভাবছে তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের সেই কথাই তুলে ধরেছেন দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিনিধি মো. তাসনিম হক রাফি।
এই নির্বাচন হতে পারে গণতন্ত্রের নবযাত্রা
একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতি কখনোই পুরোপুরি স্বচ্ছ ছিল না। স্বৈরশাসন ও সামরিক শাসনের কারণে গণতন্ত্র বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জুলাই পরবর্তী সময়ে তরুণ সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা নতুন আশার জন্ম দিচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে শিক্ষার্থী, যুবসমাজ ও জেন জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অনেকের জন্য এটি হবে প্রথম ভোট, যা নতুন বাংলাদেশের পথে মাইলফলক হতে পারে। বিগত সময়ে নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে। সেই বিশ্বাস আশা করি এবার ফিরে আসবে। একই সঙ্গে নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকে গণতন্ত্রের এই নবযাত্রায় কেউ যেন বাধা সৃষ্টি না করে। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করে, যেন মানুষের নতুন করে জেগে ওঠা গণতান্ত্রিক বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ থাকে।
-- তরিকুল ইসলাম তানিম
শিক্ষার্থী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।
নির্বাচন হোক অবাধ ও নিরপেক্ষ
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। কারণ শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতের নাগরিক ও নেতৃত্ব। আর নির্বাচন সঠিক না হলে দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই যেখানে সহিংসতা, ভয়ভীতি বা কারচুপি থাকবে না এবং সবাই স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকাই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা। নির্বাচনের পর আমরা চাই শান্তিপূর্ণ, দুর্নীতিমুক্ত ও উন্নত বাংলাদেশ; যেখানে শিক্ষা রাজনীতিমুক্ত, কর্মসংস্থান হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে এবং তরুণ সমাজ পাবে নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
-- জান্নাতুল ফেরদৌস রাখি
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, সরকারি ব্রজলাল কলেজ।
রাষ্ট্র সংস্কার ও প্রথম ভোটের প্রত্যাশা
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আসন্ন নির্বাচন শিক্ষার্থীদের কাছে শুধু ভোট নয়, এটি রাষ্ট্র সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আমরা চাই, পেশিশক্তি ও টাকার রাজনীতি থেকে মুক্ত, নিরপেক্ষ নির্বাচন। যা দেশকে শান্তিময় ও সম্ভাবনাময় করে তুলবে। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থাকে। তাই যেই নির্বাচিত হোন, তিনি যেন তরুণ প্রজন্মের চাহিদা বোঝেন, মেধার মূল্য দেন এবং অস্থিরতার অবসান ঘটান। সকল দল-মত নির্বিশেষে আমরা স্বপ্ন দেখি একটি নতুন বাংলাদেশের, যেখানে সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার থাকবে। শিক্ষার্থীরা কেবল ভোটের অধিকার নয়, তারা চায় নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব রাজনীতিতে আসুক। ত্রয়োদশ নির্বাচনে প্রথম ভোট দিয়ে আমরা চাই আমাদের ভোটের প্রকৃত মূল্যায়ন হোক।
-- সামিন তাহসিন প্রভা
শিক্ষার্থী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন আশা, পুরোনো শঙ্কা
বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে আশা ও শঙ্কার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিগত নির্বাচনের অভিজ্ঞতা হতাশাজনক হলেও এবারের নির্বাচন নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে। তবে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা। চারপাশের অস্থিতিশীল পরিবেশে অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়েও দ্বিধায় রয়েছেন। তারপরও মানুষের প্রত্যাশা যে, এই নির্বাচন ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের পথে এক ইতিবাচক সূচনা হবে। যোগ্য, সৎ ও জনগণের সেবায় নিবেদিত প্রতিনিধির নির্বাচনের মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে। এটাই আমার ও সাধারণ মানুষের আশা।
-- হুমায়রা নূর
শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দেশ হোক সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত
২৪-এর আন্দোলনের পর এটাই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। তাই এই নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ যেন মুক্ত, নির্ভয়ে ও সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারে এটাই মূল প্রত্যাশা। যে দলই বিজয়ী হোক, তারা দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে কাজ করবে এবং ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করবে, সেটাই কাম্য। আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা থাকবে, সরকারি দপ্তরগুলো সঠিকভাবে কাজ করবে এবং জনগণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুদককে শক্তিশালী করা জরুরি এবং দুদকও যেন হয় দুর্নীতিমুক্ত। পাশাপাশি মব সন্ত্রাস ও সহিংসতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচিত সরকার যেন সব ধরনের সন্ত্রাস দমন করে, এটাই আশা।
--ঐশিক নূর
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ক্ষমতার নয়, বাংলাদেশ হোক জনতার
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই আগামীর বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন হবে। শিক্ষাব্যবস্থা হবে বৈষম্যহীন ও স্বচ্ছ, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে থাকবে না কোটা বা রাজনৈতিক প্রভাব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দখলদারত্ব ও পেশিশক্তির রাজনীতি বন্ধ হয়ে সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ কার্যকর হোক। জিপিএ নির্ভরতার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ভয়হীন মতপ্রকাশ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের মাধ্যমে উন্নত ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট সুবিধাসহ একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।
--সিনথিয়া রায়হানা জেরিন
শিক্ষার্থী, কৃষি বিভাগ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
রাফি/মাহফুজ