বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক নারী রেফারি জয়া চাকমা। ক্রীড়াঙ্গন এবং নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে তিনি কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজিয়া সুলতানা
ফুটবল রেফারি হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে আপনার অনুপ্রেরণা কী ছিল?
আমাকে ফুডবল ফেডারেশন থেকে ২০১৩ সালে দেশের বাইরে কলম্বোয় পাঠানো হয়। আমাকে আর একজন মেয়ে ফুটবলারকে। তিনিও এখন ফিফায় আছেন, অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে। ওইটা একটা টুর্নামেন্ট ছিল, সাউথ এবং সেন্ট্রাল এশিয়ার মধ্যে। ওখানে গিয়ে দেখলাম যে, আমাদের বাংলাদেশ থেকে কোনো রেফারি নেই। ফিফার রেফারিও যে কেউ থাকে এটা আমার ধারণা ছিল না। আমার কাছে মনে হতো, রেফারি তো রেফারিই। কিন্তু রেফারিরও যে একটা ক্লাস আছে, আমার জানা ছিল না। দেখলাম, বিভিন্ন দেশ থেকে যে রেফারিরা আসছেন, তাদের ট্রিটমেন্ট, চলাফেরা, জ্ঞান, লাইফস্টাইল সবই অন্যরকম। এটা আমাকে খুব মোটিভেট করল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমি তো জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে খেলোয়াড় কোটায় ভর্তি হয়েছিলাম, যেটা আমার ক্যারিয়ার এবং লাইফের জন্য টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিল, ফুটবল আমাকে অনেক দিয়েছে। রাঙামাটিতে আমাকে সবাই চিনত। আমার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন আমাকে নিয়ে কথা বলত, শ্রদ্ধা করত। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। এর জন্য খেলার কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ। মনে হতো আমি তো অনেক পেয়েছি, এখন আমি কী দিতে পারি। ওই জায়গা থেকে মনে হলো, বাংলাদেশ থেকে যেহেতু কোনো ফিফার রেফারি নেই আর আমিও রেফারির ভূমিকা শুরু করেছি, তাহলে এর শেষ দেখে ছাড়ব। আমি ফিফার রেফারি হব।
একজন নারী রেফারি হিসেবে আপনি কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন?
আমি তো এখন কোচও। আমি বিকেএসপিতে ফুটবল কোচ। শুধু রেফারি হিসেবে নয়, যেটা আমি অনুভব করেছি, স্পোর্টসে মেয়েদের গ্রহণ করার মানসিকতা নেই, যেটা আসলে মেইল ডমিনেটেড সেক্টর। যেহেতু এখানে ফিজিক্যাল স্ট্রেন্থের বিষয় থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সবাই মনে করে ছেলেদের থেকে মেয়েরা দুর্বল তারা আর কী করবে, কতদূর যাবে। সে জায়গা থেকে মেয়েদের মেনে না নেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। তাই আস্থা অর্জন করা একটা চ্যালেঞ্জ। আমার সারাক্ষণ মনে হতো, যে ব্যবহারটা আমাকে সঙ্গে করে- যদি আমি মেয়ে না হয়ে ছেলে হতাম তাহলে এই ব্যবহার করত কিনা, এই কাজটা আমাকে করাত কিনা বা এভাবে অবলীলায় বলত কিনা। আরেকটা বিষয় অনুভূত হয়, যদি আমি মেইনস্ট্রিমের হতাম তাহলে এটা আমার সঙ্গে হতো কিনা; যেহেতু আমি একজন মাইনর কমিউনিটির প্রতিনিধি।
একবার বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে আন্ডার সেভেনটিন-এর খেলা ছিল, ঢাকা এবং রাজশাহীর মধ্যে। একটি গ্রুপ আমি মেয়ে রেফারি বলে খেলবে না। মেয়েদেরই খেলা ছিল এবং আমি একজন ফিফার রেফারি। আমাদের তো ক্লাস থ্রি, টু, ওয়ান, ন্যাশনাল, তার পর ফিফার রেফারি। তাও আমি খেলা পরিচালনা করলে তারা খেলবে না। ওখানে যদি একটা ছেলে খেলা পরিচালনা করে যে আমার থেকে অনেক নিচের দিকের র্যাঙ্কে আছে তাতেও তাদের চলবে। এই রকম অনেক অনেক অভিজ্ঞতা আছে আরকি।
আপনি যখন প্রথম বাংলাদেশি নারী ফিফা রেফারি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তখন আপনার কেমন লেগেছিল?
জীবনটা পূর্ণতা পেয়েছে আমার এই খেলাধূলায় এসে। আমি তো বিয়ে করিনি, মা হইনি, কিন্তু আমার অনেকগুলো ছেলেমেয়ে আছে, যাদের দেখাশোনা করি, তাদের পূর্ণতা আমাকে পূর্ণ করে। ট্রফি পাচ্ছি, অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছি, সার্টিফিকেট পাচ্ছি, যেসব আমার কাজের ভ্যালিডিটি দেয়। এর বাইরে যা আমি পাই, এই যে বাচ্চাগুলো বড় হচ্ছে, তাদের নাম হচ্ছে, দেশের জন্য তারা সার্ভ করছে, এই অর্জনের বাইরে আর কোনো অর্জন হয় না। এই যে পূর্ণতার অনুভূতি এর কোনো প্রকাশ হয় না। বিকেএসপিতে বাচ্চাগুলো যখন আসে তখন অনেক ছোট আসে। ওদের তো বাইরে যাওয়ার অনুমতি থাকে না। আমি তো বাইরে যাই, বিদেশে যাই। ওখান থেকে ফিরে এসে কী হলো, কীভাবে হলো, কী করলাম এসব যখন তাদের বলি তারা এত আগ্রহ নিয়ে শোনে এবং তারা আমি যা বলি তাতেই ওই পুরো ঘটনাগুলো বোঝে এবং আমার চোখেই ওই ঘটনাগুলো দেখে। তারা স্বপ্ন দেখে- আমিও একদিন এমন হব। এমনিতে আমি কম কথা বললেও ওদের সঙ্গে অনেক কথা বলি। কারণ, আমার ভেতর চেতনাবোধ তৈরি হয়েছে অনেক মানুষের কথা শুনে। আমি যখন রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ি, তখন সিনিয়রদের বসতে দিতে হতো আর জুনিয়ররা দাঁড়িয়ে থাকত। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। ক্লাস এইটের কয়েকজন সিনিয়র আপু নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। এর মধ্যে একজন বলছিলেন যে, ইউনিভার্সিটিতে না পড়লে জীবন কী জিনিস বোঝা যায় না। ওই একটা কথা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে। মনে হয়, আমিও তো মানুষ, আমার জীবন কী জীবন নয় তাহলে? সেই জীবন কী জীবন, যা ইউনিভার্সিটিতে না পড়লে বোঝা যাবে না? এমন অনেক কথা আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছে। আমিও যখন বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলি তখন আমার কথায় যদি একটা বাচ্চারও জীবনে পরিবর্তন আসে, সারভাইভ করে ফেলে, ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেটাই আমি দিতে চাই।
মারিয়া, বাংলাদেশের আয়রন লেডি হলো যে মেয়েটা, সে বিকেএসপিতে ছিল। আমরা তাকে রাখতে পারিনি। সে ভর্তি হয়েছিল দৌড়ের জন্য। তার অনেক লম্বা চুল ছিল, শুধু ফুটবল খেলার জন্য সে চুল কেটে ছোট করে ফেলে। আমি আগের দিন দেখলাম লম্বা চুলের মেয়ে পরদিন সে ছোট চুল নিয়ে এসেছে। কতখানি তার উইনিং মেন্টালিটি ছিল। সে খেলতে পারত না কিন্তু ভালো দৌড়াত। সে দুই বছর ছিল এখানে, কিন্তু ফুটবলে ভালো ইম্প্রুভমেন্ট না থাকায় আমরা তাকে রাখতে পারিনি। যখন সে যাচ্ছিল তাকে আমি বললাম, তোমাকে নিয়েছিলাম তোমার দৌড় দেখে। ফুটবল তোমার পরে হবে কিনা জানি না, তবে তুমি যেটা পার সেটায় আপাতত ফোকাস করো। তুমি দৌড়াতে পার। তুমি দৌড়াও। দৌড়ে কোথায় যাবে আমি জানি না কিন্তু দৌড়াতে থাকো। ওই মেয়েটা বাংলাদেশের একজন সেরা ফিনিশার।
আমি নিজেকে দিয়ে দেখেছি যে, আমি কোথায় অন্যদের চাইতে আলাদা, অন্যদের থেকে ছোট ছোট বিষয়ে নিজের পার্থক্য তৈরি করতে করতে একদিন অনেক বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। যে প্রেরণা আমার প্রতিষ্ঠানের বাচ্চাদেরও দিই।
বাংলাদেশের ফুটবলে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এটা একদিকে পজেটিভ, একদিকে নেগেটিভ। বিকেএসপিতে প্রতি বছর ১৫ জন বাচ্চা ভর্তি হয়। কিন্তু ন্যাশনাল টিমে খেলবে ১১ জনই। বাকিরা আসলে ওইখানে জায়গা করতে পারবে না, তাদের অল্টারনেটিভ ক্যারিয়ার কী হবে! অংশগ্রহণ বাড়ছে ভালো কথা কিন্তু মেয়েদেরও লিগ হয়, ছেলেদের লিগে দেখবেন কে কে খেলছে, কোন কোন ক্লাব অংশ নিচ্ছে আর মেয়েদেরটায় কী হচ্ছে। ছেলেদের হাই প্রোফাইল টিম হয় কিন্তু মেয়েদের টিম হাই প্রোফাইল হয় না। মেয়েদের ফুটবলের প্রচার-প্রসার হচ্ছে না। ভবিষ্যতের আর্থিক নিশ্চয়তার জায়গাটাও সেভাবে হয়নি। এগুলো আমাদের সীমাবদ্ধতা। এগুলো ঠিক হতে যত সময় নেবে, ততদিনে হাজার হাজার মেধাবী ঝরে পড়বে।
দেশের খেলাধুলার ভবিষ্যৎ গঠনে আপনি কীভাবে পরবর্তী প্রজন্মের ক্রীড়া পেশাদারদের বিশেষ করে নারীদের অনুপ্রাণিত করার পরিকল্পনা করছেন?
অনেকেই আমার মতো হতে চায়। আমি আমার দায়িত্ব, আমার কর্তব্য করে গেছি, এতে করে যারা ভাবছে তারা আমার মতো হবে, এটা তাদের ট্যালেন্ট। তাদের দূরদর্শিতা, গ্রহণযোগ্যতা যে তারা ভাবছে আমি ওই জায়গাটা অর্জন করতে পারি। তবে আমি যেটা করি, সেটা হচ্ছে আমার কথায়, ব্যবহারে, এই যে আমার ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে মাঠের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এগুলো আমার জীবনযাপনে ওতপ্রোতভাবে প্রভাব ফেলেছে। সেখান থেকেই অনেকের মনে হয় আমিও যদি ম্যামের মতো হতে পারতাম। এমন আমার জীবনেও হয়েছে, ন্যাশনাল টিমে আমি ছোটন স্যারের (গোলাম রাব্বানী ছোটন) সরাসরি দীর্ঘদিনের ছাত্রী। আমি কোচ হতে চেয়েছি, কারণ ছোটন স্যার মেয়েদের যেভাবে শাসন করেন, কথা বলেন, ট্রেনিং করান, আমি ঠিক উনার মতো হতে চেয়েছি। আমরা প্র্যাকটিসে ৪০ জন ছিলাম, উনি ৪০ জনকেই একই কথা বলেছেন, কিন্তু আমি রিসিভ করেছি তার কথাগুলো। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমিও একদিন স্যারের মতো হব। একইভাবে আমি যখন কথা বলি আর কেউ মনে করে আমিও ম্যামের মতো হব, সেখানে আমার বিশেষ কোনো কৃতিত্ব নেই আসলে, এটা সেই বাচ্চাটার কৃতিত্ব, যে ওই কথাটা গ্রহণ করছে।
বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী রেফারিদের আপনি কী পরামর্শ দেবেন?
তাদের জন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে, কমিটমেন্ট থাকতে হবে, হার্ড ওয়ার্ক করতে হবে। আমি ফিফার রেফারি হব, নিজের সঙ্গে এই কমিটমেন্টের পর ২০১৩ থেকে ২০২০, সাত বছর লেগেছে আমার ওই কমিটমেন্ট পূরণ করতে। এর মধ্যে আমি দুবার ফেলও করেছি। প্রথমবার আমি ২০১৭-তে পরীক্ষা দিয়েছি ২০১৮ ব্যাচ পাওয়ার জন্য, আবার ২০১৮-তে পরীক্ষা দিয়েছি ২০১৯-এর ব্যাচ পাওয়ার জন্য। তৃতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে ২০১৯-এ পাস করলাম এবং ২০২০ থেকে ফিফার রেফারি হলাম। ধৈর্য্য, কমিটমেন্টনা থাকলে আমার ওই মোটিভেশনই থাকত না। মানসিক শক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক শক্তি যদি না থাকে তাহলে এই দেশে, এই এলাকায় মেয়েরা কোনো কাজই করতে পারবে না। স্পোর্টস শারীরিক থেকে মানসিকটাই বেশি এখন। এত বেশি কম্পিটিশন। সবশেষে, সারভাইভ করার জন্য পড়ালেখা থাকতে হবে। শিক্ষা যদি না থাকে তাহলে আপনি সারভাইভ করতে পারবেন না। পড়ালেখা না থাকলে আমি এই চাকরিই পেতাম না। স্পোর্টসে মেয়েরা আসতে পারে না, কারণ এখানে যে উপার্জন তা দিয়ে পরিবার চালানো সম্ভব নয়।
আপনাকে ধন্যবাদ।
জাহ্নবী