চা-শ্রমিকদের জীবন মানেই সংগ্রামের জীবন। দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে শিশু বয়স পার করে কৈশোরে পা দেওয়া মানেই তাদের জীবনসংগ্রাম শুরু। এরকমই একজন সংগ্রামী নারী সিলেটের দলদলি চা-বাগানের শ্রমিক টুনি দাস (৬০)।
মাত্র ১০ বছর বয়সে বাগানে পাতা তোলার কাজ শুরু করেন টুনি। বড় চা-গাছের পাতা তুলে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। তখন আকারে টুনি অনেক খাটো হওয়ায় বড় চা-গাছে উঠে ঝুলে ঝুলে পাতা তুলতেন। চা-পাতা তোলার এই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে খানিকটা মুচকি হাসি দিলেন টুনি। কিন্তু পরক্ষণেই আবার তার মুখের হাসি উধাও হয়ে যায়।
টুনি তার জীবনসংগ্রামের বর্ণনা দিয়ে খবরের কাগজকে বলেন, আমার বাবা দুঃখিধন দাশ ও মা মারঞ্চনা দাস। আমার মাও এই দলদলি বাগানে পাতা তুলতেন। মায়ের পথ অনুসরণ করে ১০ বছর বয়স থেকে আমি বাগানে পাতা তোলা শুরু করি। আমার যখন ২০ বছর বয়স তখন আমার বিয়ে হয় দলদলি বাগানের বিনেশ দাসের সঙ্গে। বিয়ের পর কোনো সন্তানাদি হয়নি আমার। ২৫ বছর হয়ে গেছে আমার স্বামীও মারা গেছেন। তাই নিজের পেট চালাতে এই বৃদ্ধ বয়সে এসেও পাতা তুলি।
পাঁচ বোন ও এক ভাই নিয়ে ছিল টুনিদের সংসার। বিয়ে করে সবাই সবার মতো আলাদা থাকছেন। পাঁচ বোনের মধ্যে তার এক বোন মারা গেছেন। এক বোনের বিয়ে হয়েছে লাক্কাতুরা বাগানে। টুনিসহ তার বড় দুই বোন সুকুমারী দাস (৬২) ও আলুতি দাসের (৫৪) বিয়ে হয়েছে দলদলি চা-বাগানে বাবার বাড়ির পাশে। তাই এখন তার সুখ-দুঃখের সাথি এই দুই বোন ও মারা যাওয়া বোনের এক মেয়ে। সকালে তিন বোন মিলে গল্প করে বাগানে আসেন কাজ করতে। দুপুরে তিন বোনসহ বাগানে কাজ করতে আসা অন্য নারীদের নিয়ে লবণ চা পান করেন। কাজ শেষে আবার একসঙ্গে চলে যান বাড়িতে। এই নিয়মেই চলে টুনি দাসের জীবন।
টুনি বলেন, ‘তিন বইন এক সাথে আছি। কিন্তু তারার ঘর আলগ (আলাদা) আমার ঘর আলগ। কিন্তু বইনেরা মিলে সারা দিন এক সাথে পাতা তুলি, সব সময় তারার মুখ দেখি এইটা তো আমার শান্তি।’ এই চা-বাগানের বাইরে মানুষ বা পরিবেশ প্রকৃতি সম্পর্কে টুনি খুব একটা ধারণা নেই। তিনি নিজের জীবন থেকে উপলব্ধি করেছেন নারীদের জীবন হয় সংগ্রামের।
টুনি দাস বলেন, ‘নারীজীবন সংগ্রামের জীবন। বাবার বাড়ি কষ্ট করেছি, স্বামীর বাড়িও কষ্ট। এখন বুড়াকালেও কষ্ট। ৬০ বছর বয়সেও কাজ করছি। কাজ না করলে ভাত দিব কে। এই পাতা তুলতে গিয়ে কত ব্যথা পেয়েছি। তবু কাজ করছি বাগানে। নিজের টাকা দিয়ে ওষুধ পানি কিনা লাগে। বইনের পুরির ঘরের পুরিরে আমি পালি (লালন-পালন করেন)। আমার অনেক কষ্ট-দুঃখ আছে। আমি কাউকে বলি না। কাকে বলব মা নাই বাবা নাই, স্বামী নাই বাচ্চাকাচ্চা নাই।’
/ফারজানা ফাহমি