মায়ের মৃত্যুর পর যেন থমকে গেছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন তিন ভাইয়ের জীবন। ক্ষুধা লাগলে নির্বাক এই তিন ভাই হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে বসে থাকেন মায়ের চিতার পাশে। পটুয়াখালীর বাউফলে মানবেতর জীবনযাপন করা এই তিন ভাই এখন বেঁচে আছেন কেবল প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর ভর করে।
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধূলিয়া ইউনিয়নের চাদকাঠী গ্রামের দাসনগর এলাকায় একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করেন রিপন দাস (৪৫), সাধন দাস (৩৮) ও নিদু দাস (৩৫)। জন্ম থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এই তিন ভাইয়ের মধ্যে সাধন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আর রিপন ও নিদু বাক ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ক্ষুধা লাগলে তারা ঠিকমতো খাবারও চাইতে পারেন না।
একসময় বাবা রতন চন্দ্র দাস ও মা সরস্বতী রানীর স্নেহ-ভালোবাসায় কোনোমতে চলছিল তাদের জীবন। কিন্তু ২০২৫ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের কাঁধে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিন সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন লিভার ও কিডনি রোগে ভুগে গত মাসে মারা যান মা সরস্বতী রানীও। এরপর থেকেই আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন তিন প্রতিবন্ধী ভাই।
পরিবারের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বড় বোন প্রায় ২০ বছর আগে ভারতে চলে যান। অপর এক ভাই দিনমজুরের কাজ করে নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো সামর্থ্য তারও নেই।
স্থানীয়রা খবরের কাগজকে জানান, এখন তাদের জীবন চলে প্রতিবেশীদের দেওয়া খাবারে। কেউ খাবার দিলে তারা খেতে পারেন, না দিলে অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হয়। ক্ষুধার কষ্টে কখনও কখনও তারা খাবারের প্লেট হাতে মায়ের কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা খবরের কাগজকে বলেন, ‘এক বেলা খাবার খাইলে দুই বেলা না খাইয়া থাকতে হয়। আমরা যদি খাবার না দেই, তাইলে না খাইয়া দিন কাটে। প্রতিবেশীরা তো সবসময় সাহায্য করতে পারে না। সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি এগিয়ে আসে, তাহলে তাদের একটু উপকার হয়।’
আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার পরও তাদের মা অনেক কষ্ট করে তিন সন্তানকে আগলে রাখছিলেন। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর তারা একেবারে অসহায় হয়ে গেছে। এখন দুই বেলা খাবার দেওয়ার মতোও কেউ নাই। কেউ দিলে খায়, না দিলে না খাইয়াই থাকতে হয়।’
এদিকে, তিন ভাইয়ের দুর্দশার খবর পেয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিন প্রতিবন্ধী ভাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ কেজি চাল ও ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের পরিবারের যে সুস্থ ভাই আছেন, তার জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসন সবসময় তাদের পাশে থাকবে।’
মা-বাবা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের জীবনে এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা দুবেলা খাবার। ক্ষণস্থায়ী সরকারি সহায়তা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন স্থায়ী সহযোগিতা। স্থানীয়দের আশা, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে পারবেন এ তিন ভাই।
মশিউর মিলন/থিও