দেশের চা-বাগানগুলোতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে এসে আবাস গড়া চা-শ্রমিকদের যেমন নিজেদের পৃথক ভাষা রয়েছে, তেমনি আছে পৃথক সংস্কৃতি। তবে ফাল্গুনের ‘ফাগুয়া’ উৎসবে এসে সবাই এক হয়ে মেতে ওঠেন রঙের উৎসবে।
প্রতিটি চা-বাগানের বিভিন্ন এলাকায় তখন যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকেই রঙের ছড়াছড়ি। নানা বয়সী নারী-পুরুষরা মেতে ওঠেন ফাগুয়া উৎসবে। একে অপরের দিকে রং ছুড়ে দেন, ছন্দ-তাল লয়ের সংমিশ্রণে নেচে-গেয়ে চা-বাগানগুলোতে এভাবেই চলে সপ্তাহব্যাপী রঙের উৎসব।
গতকাল মঙ্গলবার দোল পূর্ণিমার রঙিন আহ্বানে সনাতন সম্প্রদায়ভুক্ত চা-শ্রমিকদের মাঝে শুরু হয় সপ্তাহব্যাপী ফাগুয়া উৎসব। রং, আবির, গান আর নাচে মুখর হয়ে ওঠে চা-বাগানগুলোতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল আয়োজন।
মঙ্গলবার দুপুরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা-বাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে ফাগুয়া উৎসবের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সহকারী ভারতীয় হাইকমিশনার (সিলেট) অনিরুদ্ধ দাস।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরীর সভাপতিত্বে এবং সজল কৈরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, কমলগঞ্জ থানার ওসি আবদুল আউয়াল, সিলেটের ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি রাজেশ ভাটিয়া, আলীনগর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম রানা প্রমুখ।
স্বাগত বক্তব্যে সভাপতি রাম ভজন কৈরী ফাগুয়া উৎসবের তাৎপর্য তুলে ধরেন। পরে প্রধান অতিথি অনুরুদ্ধ দাসসহ অতিথিরা চা-শ্রমিক নেতাদের গালে ও কপালে আবিরের রং ছড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধন করেন।
এরপর চা-শ্রমিকদের ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নাচ ও কাটি নাচ পরিবেশিত হয়। এ সময় দেখা যায়, চা-বাগানে শিবমন্দির প্রাঙ্গণে নানা বয়সী শতাধিক নারী-পুরুষ আবির নিয়ে রঙের খেলায় মেতে উঠেন। সবুজ চায়ের বাগান রক্তিম হয়ে ওঠে রঙে রঙে।
চা-জনগোষ্ঠীর কয়েকজন প্রবীণ সদস্য জানান, শারদীয় দুর্গাপূজার পর এটিই তাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। শত দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটনের মধ্যেও উৎসবের কয়েকটি দিন চা-জনগোষ্ঠী পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে কাটানোর চেষ্টা করেন। শ্রমিকরা এই আনন্দ ভাগাভাগি করেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে।
ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা উপভোগ করতে পেরে যেমন আনন্দে ভেসেছেন চা-শ্রমিকরা তেমন অভিভূত হয়েছেন উৎসবে আসা নাগরিক সমাজও। অনুষ্ঠানে আসা সাজু আহমদ বলেন, ‘শহরের ব্যস্ততার বাইরে চা-বাগানের এই উৎসব এক অন্যরকম অনুভূতি দেয়।’
সাংস্কৃতিক কর্মী নির্মল এস পলাশ বলেন, ‘চা-বাগানের মানুষদের নিজস্ব সংস্কৃতি এত সুন্দর ও প্রাণবন্ত, তা চাক্ষুষ না দেখলে বোঝা যাবে না।
এত বৈচিত্রপূর্ণ আয়োজন দেখে অন্য সবার মতো আমিও অভিভূত।’ রামভজন কৈরী বলেন, ‘চা-শ্রমিকরা সারা বছর বিভিন্ন সমস্যায় ভুগলেও উৎসবের দিনগুলোতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ভালো থাকার চেষ্টা করেন।’ প্রধান অতিথি অনুরুদ্ধ দাস বলেন, ‘সিলেটে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই আমার প্রথম ফাগুয়া উৎসবে অংশগ্রহণ।’