বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৯টি বিচ্ছেদের আবেদন জমা পড়ছে। এ ছাড়া প্রতি তিনটি বিয়ের বিপরীতে একটি সংসার ভেঙে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারীদের পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের আবেদনের সংখ্যা বেশি হচ্ছে।
দাম্পত্য বিচ্ছেদের এসব ঘটনা স্থানীয় সমাজে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা পারিবারিক কাঠামোর দুর্বলতা, আর্থিক চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবকে এই অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে দেখছেন।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে বরিশাল জেলায় মোট ১০ হাজার ৭৩৮টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নিবন্ধিত হয়েছে ৩২ হাজার ১৩টি বিয়ে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি তিনটি বিয়ের বিপরীতে প্রায় একটি সংসার ভেঙে যাচ্ছে। আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি বলেও জানায় কার্যালয়টি।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৫টি। ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি বিয়ের মধ্যে ভেঙে যায় ৩ হাজার ৩৪৭টি সংসার। আর ২০২৫ সালে ১৩ হাজার ৩৬৯টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৮৬টিতে।
শতকরা হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিচ্ছেদের হার ছিল ৩১ দশমিক ১ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে।
বিশ্লেষকদের মতে, বরিশালে দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙনের পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে। পারিবারিক কাঠামোর দুর্বলতা, মানসিক দূরত্ব, আর্থিক চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে ওঠার প্রবণতায় দাম্পত্য জীবনে অস্থিরতা বাড়ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর বিয়ে করে বাস্তব জীবনের চাপ সামাল দিতে না পারা অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মত তাদের।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে দাম্পত্য কলহ ঘিরে একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। নথুল্লাবাদ এলাকায় পারিবারিক বিরোধের জেরে এক ব্যবসায়ী কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন এখন অনেক পরিবারেই দৃশ্যমান।
নারীরা অভিযোগ করছেন, স্বামীর বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক নির্যাতনের কারণে অনেক সংসার টেকেনি। আবার কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্বও বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কাশিপুর এলাকার এক নবদম্পতির বিচ্ছেদের ঘটনা সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে আলোচনায় আসে। পরিবারের দাবি, আর্থিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পারিবারিক বিরোধই সম্পর্ক ভাঙনের মূল কারণ। একইভাবে নগরীর ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের এক তরুণী অভিযোগ করেন, স্বামীর পরিবারের আর্থিক চাপ ও অসুস্থতাজনিত সংকট তার সংসার ভাঙনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বরিশাল শাখার সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, ‘বিবাহ এখন অনেক ক্ষেত্রে শুধু আইনি বা আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মূল্যবোধের অভাবে সংসার ভাঙছে, যার প্রভাব পড়ছে সন্তান ও সমাজে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি ছাড়াই অনেকেই সংসারজীবনে প্রবেশ করছেন। ফলে ছোটখাটো সমস্যাও বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে।’
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম বলেন, ‘সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে একপর্যায়ে তারা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’ এ ক্ষেত্রে এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, ‘অধিকাংশ বিচ্ছেদসংক্রান্ত মামলায় বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ পুরুষদের ক্ষেত্রেও রয়েছে। তবে নারীদের পক্ষ থেকে এটি উল্লেখযোগ্য হারে আসছে।’
বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মো. মোহছেন মিয়া জানান, তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, ‘সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার না হলে আগামী দিনে বিচ্ছেদের হার আরও বাড়তে পারে, যা সমাজের জন্য নতুন চাপ ও সংকট তৈরি করবে।’