চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে। চলতি বছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ৩২ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস। আর কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিকটন। বছর শেষ হওয়ার তিন দিন বাকি থাকতে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ৫৩ বছরের মধ্যে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বাকি তিন দিনে আরও অন্তত ৩০ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হতে পারে বলে ধারণা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
রবিবার (২৯ ডিসেম্বর) এসব তথ্য জানায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বছরের শেষ সময়ে বিলাসবহুল পণ্যের এলসি খোলার জটিলতা কাটতে শুরু করায় আমদানি যেমন বেড়েছে, তেমনি গতি ফিরেছে রফতানিতেও।
বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নতুন ইয়ার্ড সম্প্রসারণ, আধুনিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং যন্ত্রপাতি সংযোজন ও দ্রুত ডেলিভারি কার্যক্রমের কারণে জাহাজগুলো অল্প সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করে বন্দর ত্যাগ করতে পারছে। ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং জাহাজ দ্রুত বার্থিং পাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিসংখ্যান মতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩২ লাখ ৫০ হাজার টিইইউএস, কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১২ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিকটন। এর আগের বছর ২০২৩ সালে ৩০ লাখ ২৩ হাজার ৭৮ টিইইউএস কনটেইনার ও ১২ কোটি ২ লাখ মেট্রিকটন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০২২ সালে ৩১ লাখ ৪২ হাজার ৫০৪ টিইইউএস কনটেইনার ও ১১ কোটি ৯৬ লাখ মেট্রিকটন কার্গো হ্যান্ডলি হয়েছিল। ২০২১ সালে ৩২ লাখ ১৪ হাজার ১৮৭ টিইইউএস কনটেইনার ও ১১ কোটি ৬৬ লাখ মেট্রিকটন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছিল।
চলতি বছরের মে মাসে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ১৯৩ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে কম ২ লাখ ৪৫ হাজার ২৬ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে ২৮ দিনের হ্যান্ডলিং হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৬৮ টিইইউএস।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ এনামুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি-টার্মিনালে এখন সর্বোচ্চ ২০০ মিটার দীর্ঘ ও ১০ মিটার ড্রাফটের বা গভীরতার জাহাজ ভিড়তে পারে। আগে সাড়ে ৯ মিটার গভীরতার এবং ১৮৬ মিটার দীর্ঘ পণ্যবাহী জাহাজ ভেড়াতে যেত। এখন ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ ২৫০০ থেকে ২৮০০ একক কন্টেইনার পর্যন্ত বহনের সুযোগ আছে। আগে তা পারতো না। এক জাহাজে বেশি পণ্য পরিবহন করার ফলে পরিবহন বাবদ সময় ও অর্থ দুটোর সাশ্রয় হচ্ছে ব্যবসায়িদের।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক বলেন, বর্তমান বন্দরের গতি ও সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজনের ফলে জাহাজগুলো দ্রুত বার্থিং পাচ্ছে, যা ২০২৪ সালের বন্দরের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের সক্ষমতা ও সকলের সহযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে এ বন্দরটি।
ব্যবসায়িরা জানান, চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে তেমনটি এগিয়ে ছিল না। ডলার সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় হারাতে বসেছিল বিশ্ব র্যাংকিংয়ের অবস্থান। তবে বর্তমানে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের জোগান বাড়ায় আমদানি ও রফতানি দুটিই বেড়েছে। আগের বছরের তুলনা বড় জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারছে। এতে কনটেইনার ও পণ্যের পরিমাণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি জাহাজের সংখ্যা কমেছে। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. আরিফ খবরের কাগজকে বলেন, চলতি বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে বড় জাহাজ আসায় বেশি পণ্য এসেছে দেশে। আবার এলসি খুলতে পারায় ও কাঁচামাল আমদানি বাড়ায় বেড়েছে শিল্পের উৎপাদনও। এতে রফতানির পরিমাণও বেড়েছে। দেশের পোশাক শিল্পের অর্ডার বৃদ্ধি বা স্থিতিশীলতা থাকায় রপ্তানি বেড়েছে।
এদিকে, রমজানকেন্দ্রিক পণ্য আমদানির ইতিবাচক প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে বন্দরের কাজে। রামজানকে সামনে রেখে ব্যবসায়িরা এলসি খোলা বৃদ্ধি করেছে। এছাড়া সিমেন্টের কাঁচামাল, পাথর, ফল ও স্ক্যাপ আমদানির উপর ভর করে এ নতুন রেকর্ড গড়েছে বন্দর।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ড অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ডলারসংকট কাটতে শুরু করায় গতি ফিরেছে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যে।
গত বছর বন্দরে আসা ৪ হাজার ১০৩টি জাহাজের বিপরীতে এ বছর এসেছে ৩ হাজার ৮২২টি। জুলাই- আগস্ট ছাত্র বিপ্লবের মধ্যে দেশের আমাদানি রপ্তানিতে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। দেখা দিয়েছিল ডলার সংকটও। তবে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বেড়ছে প্রবাসী আয়। কাটতে শুরু করেছে ডলারসংকট। সেপ্টেম্বর নভেম্বর থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য। আর তাই চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে সর্বকালে রেকর্ড ভাঙতে পেরেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবদুস সাত্তার/তাওফিক/