দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ- সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগে বড় বাধা রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাজনীতি স্থিতিশীল না হলে বিনিয়োগ আসবে না। আর এটি না হলে কর্মসংস্থান হবে না। প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। দারিদ্র্য বেড়ে যাবে। এতে করে বৈষম্যও বাড়বে।’
মঙ্গলবার (২৭ মে) রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা’ শীর্ষক সিপিডির সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, গত বছরের এপ্রিল থেকে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে রয়ে গেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আসন্ন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকবে। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হলেও বড় ধরনের নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এটি অর্জন সম্ভব হবে না বলে মনে করেন এই গবেষক।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও মাংসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ২০১৯ সাল থেকে ক্রমাগত বাড়ছে। দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সীমিত প্রতিযোগিতার ফলে বাজারে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চিনির বাজারে মাত্র পাঁচজন আমদানিকারক আধিপত্য বিস্তার করছে, যা বাজারের দুর্বল দক্ষতাকে চিহ্নিত করে। কয়েকটি খেলোয়াড়ের এ ধরনের বাজার নিয়ন্ত্রণ ভেঙে ফেলতে হবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনতে আর্থিক ও রাজস্ব নীতির মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয়, সরবরাহ-সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধান, উৎপাদন বাড়ানো এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল করা, প্রতিযোগিতা কমিশনের কঠোর তদারকি এবং বাজার পরিচালনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের মহার্ঘ ভাতা প্রদান প্রসঙ্গে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটা কি সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতে দেওয়া হচ্ছে? এই বরাদ্দ দেওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এখন যে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়, তার বদলে এটি দেওয়া হবে। এতে সরকারি ব্যয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে। এতে করে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন হয়েছে। ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ায় প্রবাসীরা বৈধ পথে বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। প্রবাসীদের জন্য সরকারকে আরও প্রণোদনাব্যবস্থা করতে হবে। বেশি রেমিট্যান্স আসায় বৈদেশিক রিজার্ভ বাড়ছে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৪ বিলিয়নে ছিল। যা দিয়ে ৬ মাসের আমদানি বিল পরিশোধ করা সম্ভব।
ফাহমিদা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হলেও এর কোনো অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুঁজিবাজারে নতুন করে তালিকাভুক্ত হতে চায় না। বহুজাতিক কোনো কোম্পানিও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এখনো কারসাজি রয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। শিল্পের গ্যাস ঘাটতির কারণে উৎপাদন ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। কৃষিতেও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতা ২০১১ সালে ৭ হাজার ২৬৪ মেগাওয়াট থেকে ২০২৪ সালে ২৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। তারপরও লোডসেডিং কমেনি। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সংস্কারেও জোরদার করতে হবে।’
জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডিসেম্বর বা জুনে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে আগামী ৭ থেকে ১৩ মাসের ভেতরে নির্বাচন হচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচন হয়ে গেলেই বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধির জগতে প্রবেশ করবে, তা কিন্তু নয়। প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে হবে। ব্যাংকিং খাত, এনবিআরসহ অন্যান্য খাতের সংস্কার হলেই কেবল বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগের জন্য গ্যাস দেওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বাপেক্সের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। সংস্কারের জন্য নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কালোটাকা সাদা করার বিধান এবারও থাকছে শুনেছি। কিন্তু এটা কোনোভাবেই ঠিক না। আমরা স্পষ্টভাবে বলছি এটা কোনোক্রমেই সমর্থন যোগ্য নয়। নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক নয়। কারণ অবৈধভাবে যে টাকা প্রদর্শন করা যায় না তা বৈধ করার সুযোগ অযৌক্তিক। আবাসন খাতে এসব টাকা কাজে লাগানো হয়। মৌজা মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্যে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচা হয়। এবারে তো সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটা ভালো দিক। নীতিমালার যে ঘাটতি আছে তা সংশোধন করা হবে। এটা সংস্কারেরই অংশ। রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে। এ জন্য বিনিয়োগে চাঞ্চল্যতা ফিরে আসেনি।
সিপিডি বলছে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এরই অংশ হিসেবে বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। এফডিআইকেও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ভালো উদ্যোগ।