এবারের বাজেট ব্যবসায়ী, তরুণ, শ্রমিক, নারী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ কাউকেই খুশি করতে পারেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণে প্রতিটি খাতের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এমন মন্তব্য উঠে এসেছে। চলমান বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে বাজেটে তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকার কথাও উঠে এসেছে।
রবিবার (২২ জুন) রাজধানীর গুলশানের এক হোটেলে বাজেট নিয়ে এক সংলাপের আয়োজন করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ সময় বক্তব্য রাখেন অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক রুমিন ফারহানা, তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এনামুল হক খান, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ ও বস্ত্রকলের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা।
অনুষ্ঠানে অধিকাংশ সময়ই বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয় ব্যবসায়ী, তরুণ, শ্রমিক, নারী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্টদের। তারা বলেন, একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ধরনের সরকার এবারের বাজেট প্রণয়ন করেছেন। এই সরকারের রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডা না থাকায় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। অর্থ উপদেষ্টাও বাজেটে সাধারণ মানুষকেই প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বাজেটে তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি নেই বললেই চলে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, গায়েবি মামলার সংস্কৃতি দেশের পুরো ব্যবসায় পরিমণ্ডলকে এক ধরনের গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এটার পরিবর্তন আনার জন্য অর্থ উপদেষ্টা বাজেটে কিছুই রাখেননি।
বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটাতে শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় নয়, পুরো সরকার ব্যবস্থাকেই কাজ করতে হবে জানিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বিচার বিভাগসহ প্রতিটি মন্ত্রণালয় যদি সঠিকভাবে কাজ না করে, তাহলে হবে না।’
হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ‘‘এসব বিষয়ে আমাদের রেগে যাওয়ার সময় হয়েছে। এটি অযৌক্তিক রাগ নয়। আমি এটাকে বলব পবিত্র রাগ। যে রাগের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করতে হয়। এখন ওই রেগে যাওয়ার মুহূর্ত হয়েছে। কারণ এই সরকারের মধ্যে একটা ‘পিকুলিয়ার সিনড্রোম’ (উদ্ভট লক্ষণ) দেখতে পাচ্ছি। আমি বলব, একটি নতুন ধরনের কুম্ভকর্ণ ‘সিনড্রোম’। শুনে কিন্তু সাড়া দেয় না।’’
বাজেটে বড় কোনো সিদ্ধান্তের জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অনেকে বলছেন বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদে চারজন অর্থনীতিবিদ রয়েছেন। তারপরও কেন গতানুগতিক বাজেট হলো। আমি মনে করি উপদেষ্টা পরিষদের সবাই অর্থনীতিবিদ হলেও ব্যতিক্রম কিছু হতো না। কারণ বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে যে সাহস দেখাতে হয় সেটির জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘এটি একটি ‘ট্রাডিশনাল, প্রুডেন্ট’ বাজেট হলেও ‘ইমপ্যাক্টফুল’ নয়। বাজেটে বেসরকারি খাত, শ্রমিক খাত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কিছু নেই; রয়েছে বৈষম্য। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নেও তেমন কিছু দেখা যায়নি।’
অর্থনীতিতে ‘নন-ট্যাক্স রেভিনিউ’-তে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলার পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘এক ধরনের উচ্চাভিলাষ বাদ দিয়ে বাজেটে আরেক ধরনের উচ্চাভিলাষ দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এটি অবকাঠামোগত বাজেট। কিন্তু সক্ষমতার ঘাটতি দূর করার বিষয়ে তেমন কিছু নেই।’
দেশের অর্থনীতিতে সামনে পাঁচটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন হোসেন জিল্লুর। এর মধ্যে অন্যতম ‘স্পিড চ্যালেঞ্জ’- অর্থনীতি কী গতিতে এগোবে, তা নিশ্চিত করা। ‘প্রতিবছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। আগে থেকেই অনেক বেকার বসে আছেন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার মান উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা হচ্ছে, কিন্তু মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না। এটি ঠিক না হলে বাংলাদেশ গতি পাবে না।’
তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন ‘গ্রোথ ড্রাইভার’ খুঁজে বের করার ওপরও জোর দেন হোসেন জিল্লুর। তিনি বলেন, ‘আগামী দিনের প্রধান প্রবৃদ্ধির চালক হবে কৃষি। ফার্মাসিউটিক্যালস ও আইসিটিতে সম্ভাবনা থাকলেও কৃষিই হবে মূল চালক। সে জন্য এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি কমাতেও এখনই পদক্ষেপ জরুরি। চিন্তার উত্তরণের সময় এসেছে।’
অনুষ্ঠানে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘বিশ্বমানের চারজন অর্থনীতিবিদ থাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার পরও হতাশার বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে যে বরাদ্দ, তাতে আমূল পরিবর্তন আনতে পারতো অন্তর্বর্তী সরকার। যা পরবর্তী নির্বাচিত রাজনৈতিক দলগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারতো।’ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ হবে না উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যে সরকারের নিশ্চয়তা থাকে না, সেই সরকার কখনোই ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য সুসংবাদ বয়ে আনবে না।’
শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ব্যাংক লুটেরাদের দায় মেটাতে ব্যবসায়ীদের চড়া সুদ দিতে হচ্ছে। বিগত সরকারের মূল সমস্যা ছিল তথ্যের বিকৃতকরণ। বর্তমান সরকারও সেই দিকেই যাচ্ছে। সম্প্রতি সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা বেশকিছু কারখানা পরিদর্শন করে স্বীকার করেছেন গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু সরকারের প্রেস সচিব বলেছেন, গত মে মাসে ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত গ্যাস শিল্পে দেওয়া হয়েছে। সেটা যদি হতো, তাহলে তো মিটারই ফেটে যেত। এসব তথ্য তারা কোথা থেকে দেয়, তা আমরা জানি না। বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বেকারত্ব বাড়ছে।
তারপরও সরকার বাজেটে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কমিয়েছে। কেন করেছে তা আমার বোধগম্য নয়। এ সময় তিনি বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটাতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর একটা বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে দেশের চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট। কিছু রাজস্ব পদক্ষেপ বাজেটের মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এসব লক্ষ্যকে বাস্তবায়নে যথাযথ বরাদ্দ বা পদক্ষেপ নেই। তবে বাজেটে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। এগুলো হলো কর ছাড়, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও প্রণোদনা এবং ক্ষতিকর কার্যক্রমে উচ্চ কর আরোপ।
প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া রাজস্ব বাড়বে না। সংস্কারের ক্ষেত্রে একটা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দরকার। ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারে না। কেন সেটা পারে না? কারণ সেখানে কোনো কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখনো হয়নি। সংস্কার ছাড়া এ ধরনের কাঠামো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে রেখে দিলে এমন ঘাটতি চলতেই থাকবে।
তিনি বলেন, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের বাজেট আকারে ব্যতিক্রম। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ছোট। বাজেটে প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে সামগ্রিক উন্নয়নে এবং ভৌত অবকাঠামোর পরিবর্তে মানুষের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এসব লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ বাজেট বরাদ্দ বা পদক্ষেপ নেই। বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর ছাড়, বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও প্রণোদনা এবং ক্ষতিকর কার্যক্রমে উচ্চ কর আরোপ। তবে, প্রস্তাবিত বাজেট সামগ্রিকভাবে চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের জন্য স্বস্তি আনতে পারত। অন্যদিকে কিছু রাজস্ব পদক্ষেপ বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য– ‘একটি সমতাভিত্তিক ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গঠন’- এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেহেতু ২০২৬ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদনের পথে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেট অন্তর্বর্তী সরকার প্রণয়ন করবে কি না আমরা জানি না। কিংবা নতুন সরকার করবে। তারপরও যেসব অসামঞ্জস্যতা, ঘাটতি পাচ্ছি- বাজেটের একটা মধ্যবর্তী রিভিউ হওয়া প্রয়োজন। সেটা অ্যাসেসমেন্ট করে জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন। বাজেটের মধ্যবর্তী একটা সংশোধন, অ্যাসেসমেন্ট ও রিভিউ দরকার। তারপর কাঠামোর মধ্য থেকে পরিমার্জন করা প্রয়োজন, যাতে এর মধ্যে স্বচ্ছতা থাকে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর সবার মধ্যে একটা বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটে তা পূরণ হয়নি। বাজেটের মূল দর্শন যাদের বেশি আয় তাদের থেকে বেশি কর নিয়ে তুলনামূলক পিছিয়ে পড়াদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যয় হবে। তবে আমাদের বাজেটের তিন ভাগের দুই ভাগই পরোক্ষ কর। তিনি বলেন, বাস্তবতার নিরিখে এই বাজেট বড়। তবে অর্থনৈতিক প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে অপ্রতুল। এ ছাড়াও বাজেটে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল। এটি বাজেটের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, বাজেটের লক্ষ্য সম্পদ পুনর্বণ্টন। অর্থাৎ ধনীদের কাছ থেকে কর নিয়ে গরিবদের দেওয়া হবে। কিন্তু পরোক্ষ কর বাড়লে দরিদ্রদের ওপর করের বোঝা চাপে।