বুধবার শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। আর এই রমজানের অজুহাতে সবজি ও মুদি দোকানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ব্যবসায়ীরা । এতে দিশেহারা হয়ে পগেছের নিম্নআয়ের মানুষ ।
উপজেলার কাঁচাবাজার ও মুদি দোকানগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীত মৌসুমের সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও দামে তার কোনো প্রভাব নেই। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ–সব মিলিয়ে বাজারে গেলেই হিসাবের খাতা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে- এমন অভিযোগ ক্রেতাদের।
গৌরীপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. আজিজ বলেন, মোকামেই এখন বাড়তি দাম। তারা যে দামে পাইকারি কেনে সেই হিসাবেই খুচরা বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে। তাই খুচরা বাজারে আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে মুদি দোকানে নিত্যপণ্যের চড়া দাম উপজেলার পৌর বাজার, গৌরীপুর, ইলিয়টগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, মোটা চালের কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, চিকন চাল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ছোট দানার মসুর ডাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা এবং মুগডাল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম ২০০টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা।
ক্রেতারা বলছেন, এই দাম নির্ধারিত আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ। মাসের শুরুতেই বড় অঙ্কের টাকা বাজারে চলে যাচ্ছে।
শীতের সময় ফুরিয়ে এলেও বাজারে শীতের সবজির কমতি নেই। তবুও দামে স্বস্তি নেই। সবজিতে রোজার আগেই বাজারে সবজির দাম চড়া। লেবুর হালি ১৪০ টাকা প্রতিটি ৩৫ টাকা, টমেটোর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। গাজর, শিম ও বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজি। কালো বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শালগম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মুলা ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি। ফুলকপি ও বাঁধাকপির পিস ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এক আঁটি পালংশাক কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০ টাকা। লালশাক ও মুলাশাক ২০ থেকে ২৫ টাকা আঁটি। লাউয়ের পিস ৬০ থেকে ৮০ টাকা। সবজির দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
উপজেলার পৌর সদরে বাজারে করতে আসা মরিয়ম বেগম বলেন, আগে যে টাকায় এক সপ্তাহের বাজার হতো, এখন সে টাকায় তিন-চার দিনের বেশি চলবে না। রমজানে বাজার করাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে গেছে, সবজিতে ভরা অথচ টমেটো, শিম, গাজরের দাম ৬০-৭০ টাকার কাছাকাছি। এমন দামে মানুষ স্বস্তিতে থাকবে কীভাবে? আর রমজানেই বা খাবে কী?
হাজী মোহাম্মদ মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আমরা আজব দেশে বাস করি, রমজানকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর সকল দেশে দ্রব্যমূল্যের দাম ছাড় দেওয়া হয়। আর এ দেশে রোজায় দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়।
নির্ধারিত আয়ের মানুষ রমজানে পড়েছে বাড়তি ভোগান্তিতে। গৌরীপুর বাজারে আসা রাজীব হোসেন জয় বলেন, ‘চাল-ডালের দাম কমছে না, ভোজ্যতেল অনেক দিন ধরেই চড়া। ৫০০ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে খুব বেশি কিছু কেনা যায় না। বেতন বাড়েনি, কিন্তু বাজার খরচ নিয়মিতই বাড়ছে এটাই আমাদের মতো মানুষের ভোগান্তি।’
মাছ-মাংসের বাজারেও একই চিত্র। স্বস্তিতে নেই খেটে-খাওয়া নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ। মাঝারি সাইজের রুই মাছ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, মৃগেল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি। শিং মাছ ৪০০ থেকে ৩৫০ টাকা, পাবদা ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাংসের বাজারে গরুর মাংস কেজি ৮০০ টাকা, খাসির মাংস এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। তবে তুলনামূলকভাবে ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা কমে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
ইলিয়টগঞ্জ বাজারের মাংস বিক্রেতা মনির কসাই বলেন, ‘গ্রাম থেকে গরু কিনতে গেলে রোজার অজুহাত দেখিয়ে গিরস্তরা গরুর দাম বাড়িয়ে দেয়। আর অনেকে মনে করে আমরা ইচ্ছা করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করি। বর্তমানে গরুর দাম বেশি। পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে, তাই খুচরা বাজারে গরুর মাংস আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’
চাল ও ডালের দামের বিষয়ে মেরাদিয়ার ব্যবসায়ী আশীষ সাহা জানান, মিল ও আড়ৎ থেকে যে দামে চাল-ডাল আসছে, ভাড়া আর দোকান খরচ যোগ হলে খুচরা দামে প্রভাব পড়বেই। ডালের ক্ষেত্রেও আমদানি ও সরবরাহ ব্যয়ের কারণে দাম কমছে না।
গৌরীপুর বাজারের ব্যবসায়ী গৌরাঙ্গ কৃষ্ণ লাল বলেন, ‘এখন তেলের দাম মূলত কোম্পানি ও ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত। আমরা বেশি দামে কিনলে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই। দাম বেশি থাকায় বিক্রিও কমে গেছে। মোকামেই এখন বাড়তি দাম। তারা যে দামে পাইকারি পণ্য কেনে সেই হিসাবেই খুচরা বিক্রি করতে হচ্ছে।’
ক্রেতাদের দাবি ভোক্তা অধিকার আইনে উপজেলার বিশেষ বাজারগুলোতে সরকারি নজরদারি প্রয়োজন। বাজারে এখনো স্বস্তির কোনো ইঙ্গিত নেই।
একটি বেসরকারি এনজিওর সদস্য মো. ইয়াছিন মিয়া খবরের কাগজকে জানান, আয় বাড়ছে না অথচ নিত্যপণ্যের দাম কমার কোনো লক্ষণও নেই। বাজারে কার্যকর তদারকি ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ না থাকলে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে এমন আশঙ্কাই এখন সবার।
দাউদকান্দি পৌর বাজার কমিটির সভাপতি, পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার ভূমি রেদওয়ান ইসলাম বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পৌর প্রশাসক সব ধরনের পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে বাজারে কাজ করছে। তবে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বেশি। শীতেও সবজির বাজার অসহনীয়, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের। ব্যবসায়ীরা সৎ না হলে ক্রেতারা ঠকতেই থাকবে। তার পরও যদি কোনো অসাধু ব্যবসায়ী রোজাকে কেন্দ্র করে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।