বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে ১১ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে ভারতের সঙ্গে গত দেড় বছরে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার কাছে এগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে আগামী দিনে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সহজ ও ভালো করা যায়।
সোমবার (২ মার্চ) দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ও বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মার বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান এবং অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি’ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্য রুট হলেও, প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
মন্ত্রী সম্ভাব্য সামুদ্রিক নৌ চলাচল বিঘ্ন এবং সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পরিবেশ নিয়েও আলোকপাত করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে বলেন, ‘বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।’ তিনি উল্লেখ করেন, যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রণালিটি বন্ধ থাকে, তবে তা বৈশ্বিক শিপিং ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘এখনই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার সময় নয়, পরিস্থিতি কয়েক দিনের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে।’ এ সময় জ্বালানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিয়ে জনসাধারণের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
বৈঠকে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
মন্ত্রী বলেন, ‘ভারত ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপি নিয়ে বাংলাদেশের একটি প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মধ্যে বাংলাদেশ প্রায় ৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে এবং ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি করে।’
মন্ত্রী এ সময় কিছু রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ এবং গত ১৮ মাসে কয়েকটি সীমান্ত হাট ও স্থলবন্দর বন্ধ থাকার বিষয়টিও উত্থাপন করেন। তবে তিনি জানান, কিছু সীমান্ত বন্ধ থাকলেও বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর চালু রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণ প্রক্রিয়া স্থগিতের আবেদনপত্র পাঠিয়েছে, যা বর্তমানে জাতিসংঘ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন।
মন্ত্রী এই বৈঠকটিকে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী: প্রণয় ভার্মা
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা।
সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে আসার সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ সহযোগিতা যেন নিজ নিজ জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে হয়, সেটি নিয়েও কথা হয়েছে। কীভাবে এটিকে আরও ভবিষ্যৎমুখী, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর করা যায়, আমাদের অর্জনগুলোকে ব্যবহার করে কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা যায়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করা যায়, এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং পারস্পরিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখীভাবে একসঙ্গে কাজ করে আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং মানুষকেন্দ্রিক সহযোগিতা জোরদার করার আমাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছি।’
প্রণয় ভার্মা বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী বাণিজ্য, অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। কীভাবে এটিকে আরও এগিয়ে নেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। কীভাবে দুই দেশের বিভিন্ন খাতে ব্যবসাগুলোর জন্য পারস্পরিক সম্পৃক্ততা সহজ করা যায় এবং কীভাবে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি, যাতে আমাদের ভৌগোলিক নৈকট্য, দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তা নতুন অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তরিত করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
সিইপিএ চুক্তি বা ট্রান্সশিপমেন্ট নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না; জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। তবে অবশ্যই এসব বিষয় আমাদের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক আলোচনার অংশ। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য স্থলবন্দর গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া নতুন প্রেক্ষাপটে আমাদের নতুন অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে কী ধরনের কৌশল হওয়া উচিত, এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের খুব প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে।’