চার দিন পরই ঈদুল আজহা। অনেকেই রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন। তারপরও রাজধানীর বাজারগুলোতে সব জিনিসের দাম বাড়ছে। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিম, আদা, সয়াবিন তেলসহ আটটি জিনিসের দাম বেড়েছে। এক মাসের ব্যবধানে এসব পণ্যের দাম আরও বেড়েছে।
এক মাস আগে ডিমের ডজন ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। গতকাল তা ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ১৪০ থেকে ১৮০ টাকার আদার কেজি ২২০ থেকে ২৪০ টাকা ছুঁয়েছে। বোরো ধান উঠলেও কমেনি চালের দাম। ১৭৫ টাকার প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১৯০ টাকা, চিনির কেজি ১১০ টাকায় ঠেকেছে। আগের মতোই সবজি উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাড়েনি জিরা-এলাচসহ অন্য মসলার দাম। বাজারভেদে একই পণ্য ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কম-বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় বাংলাদেশ থেকে তা মুছে দেব। দেশে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আর বাজার নিয়ন্ত্রিত হবে না।’ তারপরও বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। ভোক্তাদের অভিযোগ–বিএনপি সরকার তিন মাসেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে কঠোর মনিটরিং নেই। এই সুযোগে অসাধু চক্র সিন্ডিকেট করে চড়া দামে পণ্য বিক্রি করছে। ভোক্তাদের পকেট কাটছে।
১৫০ টাকায় স্থির ডিমের দাম
গত এপ্রিল মাসে ডিমের ডজন ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। পুরো মাসেই এই দামে বিক্রি হয়। এ মাসে দাম বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। গতকালও বিভিন্ন বাজারে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্রয়লার ও দেশি মুরগির দামও কমেনি। গত মাস থেকে ব্রয়লার মুরগি ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা, গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ ও খাসির মাংস ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে মাসের ব্যবধানে সোনালি মুরগি ৩৮০ থেকে কমে বর্তমানে ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হাতিরপুল বাজারের ওহাব আলী ও টাউন হল বাজারের মো. কামাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘লাল ডিমের ডজন ১৫০ টাকা, সাদার ডজন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারিতেও দাম কমেনি। তাই আমাদেরও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’ অন্য বিক্রেতারাও বেশি দামের কথা জানান। মাছের দামও কমে না। রুই, কাতল মাছও আগের মতো ৩৬০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, নদীর চিংড়ি, কাজলি, ট্যাংরাসহ অন্যান্য মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে চাষের এসব মাছ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। তেলাপিয়া মাছও আকারভেদে ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি, পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
আদার দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ
গত মাসে বিভিন্ন বাজারে আদার কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল তা ২৪০ টাকায় ঠেকেছে। কেজিতে বেড়েছে ৯০ টাকা বা ৬০ শতাংশ। কৃষি মার্কেটের খুচরা বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোরবানির ঈদে আদার চাহিদা বাড়ায় দাম বাড়ছে। আগে কম দামে বিক্রি হলেও বর্তমানে বেশি দামে কেনা। তাই কম দামে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। ২২০ থেকে ২৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’
আদার পাশাপাশি অন্যান্য মসলার দামও বেশি। দেশি রসুনের কেজি ১০০ টাকা, চায়না রসুন ১৮০ টাকা, জিরা ৬৮০ টাকা, এলাচ ৫ হাজার ৬০০ টাকা, লবঙ্গ দেড় হাজার টাকা, দারুচিনি ৫৪০ টাকা।
বোরো ধান উঠলেও কমেনি চালের দাম
হাওর থেকে শুরু করে সারা দেশের বোরো ধান খেত থেকে ঘরে উঠে গেছে। তারপরও কমেনি কোনো ধরনের চালের দাম। গতকালও আগের মতো মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬০ থেকে ৬৫ ও মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে পোলাওর চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ১৫ টাকা। প্রাণ, আকিজসহ বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত পোলাওর চাল ১৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৯০ টাকায় ঠেকেছে।
নিউমার্কেট বাজারে সোনালি স্টোরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুরুল হুদা নামে এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের তিন মাস হয়ে গেল। এখনো বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারল না। যে যার মতো সিন্ডিকেট করে দাম আদায় করছে। দেখার কেউ নেই।’ মাসের ব্যবধানে চিনির দামও ১০৫ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
উচ্চমূল্যেই সবজি বিক্রি
বাজারে এখনো শীতের কপি, টমেটো বিক্রি হচ্ছে। গ্রীষ্মকালের সবজিও ভরে আছে বাজার। তারপরও কমছে না সবজির দাম। বিভিন্ন বাজারের অধিকাংশ দোকানে বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পটোল ১০০ থেকে ১২০, কাঁকরোল ১২০ টাকা, হাইব্রিড শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, দেশি শসা ১০০ থেকে ১২০, বরবটি ও কচুরলতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, সজনেডাঁটা ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়। টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকায় ঠেকেছে। এ ছাড়া করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করা হয়। ঝিঙা, ধুন্দুল, চিচিঙ্গাও ৮০ টাকা ও কাঁচা পেঁপে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা, ডাল, ডিমসহ অধিকাংশ জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। সার্বিক ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি ভোক্তা অধিদপ্তরের ডিজি থাকা অবস্থায় কোল্ড স্টোরেজে ডিম রাখতে দিইনি। তা বের করেছি। তখনো ঈদ হয়েছে। কিন্তু এত বেশি দাম বাড়েনি। বর্তমানে কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং হচ্ছে না। কারও জবাবদিহি নেই। এতে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন। তারা সিন্ডিকেট করে জিনিসের দাম বাড়াচ্ছেন। ভোক্তাদের পকেট কাটছেন। ভোক্তা অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও বিভাগ রয়েছে। তারা কী করছে। তারা কি এসব দেখে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত বাজারে নজরদারি বাড়ানো।’