কিংবদন্তি রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ও ছায়ানটের সভাপতি সনজিদা খাতুন আর নেই। খ্যাতিমান এই শিল্পীর মৃত্যুর খবরে শোকাহত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীসহ সংগীতপ্রেমীরা। দেশ বরেণ্য এই শিল্পীকে নিয়ে কথা বলেছেন দেশের দুই প্রজন্মের দুই নন্দিত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও অণিমা রায়। তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন- এ মিজান
রবীন্দ্রসংগীতের এক পথপ্রদর্শককে হারালাম: বন্যা
খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সন্জীদা খাতুন মারা গেছেন। এই খবরটি নিউইয়র্ক থেকে খবরের কাগজ প্রতিবেদকের কাছেই প্রথম শুনেছেন আরেক নন্দিত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। সন্জীদা খাতুনের মৃত্যুর খবরটি শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বন্যা। কাঁদতে কাঁদতে বারবার কথা আটকে যাচ্ছিল বন্যার। একপর্যায়ে কথা বলতেই তার কষ্ট হয়। একটু দম নিয়ে শুরু করেন সন্জীদাকে নিয়ে। কান্নামাখা কণ্ঠে বন্যা বললেন আমি ভীষণ শোকাহত। এমন একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ এভাবে পাব কল্পনাও করতে পারিনি। সন্জীদা আপা আমাদের রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীদের সবার গুরু। তিনি নেই এটা ভাবতেই পারছি না। আমি নিউইয়র্কে আছি চাইলেই শেষ দেখাটাও দেখতে পারছি না। এই দুঃখটা আমার সারা জীবন থেকে যাবে। দীর্ঘ একটা জীবনে সন্জীদা আপার সঙ্গে ছিলাম। কত পরামর্শ পেয়েছি তার কাছে। কতটা শিখেছি এটা বলে শেষ করা যাবে না। আমি ভীষণ মর্মাহত। উনার মতো একজন ভীষণ গুণী শিল্পীর মৃত্যুর ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। আমরা আমাদের রবীন্দ্রসংগীতের এক পথপ্রদর্শককে হারালাম।
শুধু গান নয়, উনার কাছে একটা জীবন শিখেছি: অণিমা রায়
আমি ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর ছায়ানটে ভর্তি হই। তখন থেকেই সন্জীদা খাতুনের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি আমার শিক্ষাগুরু। আমি সরাসরি তাকে ক্লাসে পেয়েছি। তিনি একদম আলাদা করে গান শেখাতেন। অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় তিনি গান শেখাতেন। কথা কম বলতেন। নীতি, আদর্শ, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম ও সংস্কৃতি সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন তিনি।
উনার কাছে শুধু গান নয়, একটা জীবন শিখেছি। তিনি আমার আদর্শ। রবীন্দ্রনাথকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি যেভাবে লালন ও ধারণ করেছেন সেভাবে আর কেউ করেননি। তার চলে যাওয়া মানে অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে গেল আমাদের সংস্কৃতির জন্য। মনে হচ্ছে আজ সত্যিকার অর্থেই হেরে গেলাম। এই সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যখন আমরা দোলাচলে আছি সন্জীদা খাতুনকে সামনে রেখেই ভরসায় বুক বেঁধেছি। বলতে গেলে তাকেই জোড়াতালি দিয়ে বেঁচে আছি আমরা। সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলার আর কেউ তো রইল না। তার মতো করে কেউ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবেন না। তিনিত শুধু একজন শিল্পী নন, একজন গবেষকও। এত নিভৃতচারী মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। উনাকে কোনো উপমায় আসলে বাঁধা যাবে না। আমি যখন নিজের মতো করে গান শুরু করি তখন থেকেই উনার সঙ্গে কিছুটা দুরত্ব তৈরি হয়েছে আমার ব্যস্ততার জন্য। আমি আবার সব সময়ই আমার প্রিয় মানুষ থেকে একটু দূরে থাকার চেষ্টা করি। কারণ প্রিয় মানুষ যেন আমার কোনো কাজে কষ্ট না পায়। তিনি যেভাবে ছিলেন সেভাবেও যদি বেঁচে থাকতেন তাহলেও আমরা অনেক আনন্দ পেতাম। এ সময় তাকে খুব বেশি দরকার ছিল।
/ফারজানা ফাহমি