দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ঢাকাতেই বসবাস করছেন সত্তর দশকের বিশিষ্ট কবি আতাহার খান। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে, তারপর চাকরি-জীবন। এখন অবসর যাপন। তার জন্মস্থান ফরিদপুর শহর। সেখান থেকেই ১৯৬৮ সালে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স (১৯৭৪) ও এমএ (১৯৭৫) সম্পন্ন করেন। পিতা আমজাদ হোসেন খান, মাতা আমেনা বেগম।
৮ নম্বর সেক্টরের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা তিনি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে ফরিদপুর অঞ্চলে সরাসরি অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নেন। এর মধ্যে মোমিন খাঁ ঘাট, গোয়ালন্দ নৌবন্দর, খানখানাপুর ব্রিজ অপারেশন, বারোখাদা ব্রিজ অপারেশন, কামারখালী ঘাট অপারেশন এবং ৯ ডিসেম্বর ফরিদপুর শহরের অদূরে অবস্থিত ধোপাডাঙ্গা চানপুর যুদ্ধ উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘রোববার’ ও ‘পূর্ণিমা’র অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরে দৈনিক ‘আমার দেশ’, ‘আমাদের সময়’, ‘সকালের খবর’ ও ‘যুগান্তর’ ইত্যাদি জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় দায়িত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।
তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কবিতার বই ‘শব্দের আকাঙ্ক্ষায় সূর্য’ (যৌথ, ১৯৭২), ‘শিরস্ত্রাণ খোলো যুবরাজ’ (১৯৯৭), ‘এই জলকণা নাও নদী’ (২০০০), ‘প্রেমের কবিতা’ (২০০১), ‘দ্বিতীয় প্রেম ও কিছু দাগ’ (২০০২), ‘আমার পৃথিবী’ (২০০৪), ‘দাঁড়ানোটাই মূল কথা’ (২০০৮), ‘কবিতাসংগ্রহ’ (২০১১), ‘শূন্যে শুয়ে আছি’ (২০১৫), ‘বিপ্লব এখন সংজ্ঞাহীন’ (২০২০), ‘জ্বলছি এখন’ (২০২৩) ইত্যাদি।
এ ছাড়া তার কিছু শিশু ও কিশোর উপযোগী বই রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায়, ‘হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা’, ‘টুটুলের পৃথিবী’, ‘টুটুলের দ্বিতীয় পৃথিবী’, ‘টুটুলের অঙ্গীকার’ ইত্যাদি।
আপনি এখন কী লিখছেন?
কবিতা তো লিখছি। এর বাইরে কিছু গদ্যের বই লিখবার চেষ্টা করছি। তার একটি হলো ‘বাংলাদেশ’ নিয়ে একটি বই। চেষ্টা করছি- সেখানে থাকবে এর আদি পর্ব, মধ্য যুগ, পাকিস্তান পর্ব, বাঙালি জাতিসত্তার উন্মেষ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশ। আর হ্যাঁ, স্বীকার করে নেওয়া ভালো, এটি ভীষণ কষ্টসাধ্য কাজ। কারণ রেফারেন্স হিসেবে জোগাড় করা বইগুলোর মধ্যে কোনো কোনো বই বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা। সেখানে দলীয় রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করবার নগ্ন প্রচেষ্টা দেখা গেছে। ফলে এসব বই দলীয় প্রেস-রিলিজ বা দলীয় ক্রোড়পত্রে পরিণত হয়েছে।
পাশাপাশি এখন হাতে আছে আমার আরও একটি বড় কাজ। ‘কবিতাসংগ্রহ’র দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশের কাজ চলছে।
আপনি নিজেও একজন কবি। নিশ্চয়ই জানেন, কবিতায় কোনোরকম অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ নেই। এখানে শুধু সচেতন থাকলেই চলবে না, মেধার ঠিকঠাক প্রয়োগেরও প্রয়োজন আছে। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে একটা অর্থ ও বিষয় দাঁড় করানো যায় অনায়াসে, কেউ কেউ হয়তো তা করেনও, এই পথ ভালো কবিতার স্বার্থে অনুসরণ করা ঠিক নয়। লক্ষ্য থাকা চাই ভালো কবিতা রচনা, সেখানে শব্দের ব্যবহার যেন হয় লক্ষ্যভেদী, ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই যেন শব্দব্যক্তিত্বরূপে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর হয়। এটা যদি সফল এবং সুচারুভাবে করা সম্ভবপর হয়, তাহলে ব্যবহৃত শব্দগুলো ছবি হয়ে ধরা দেবে, কথা বলবে, উড়ে বেড়াবে বিচিত্র রঙের খেলা, বোধোদয় হবে নতুন নতুন উপলব্ধির- তখন অপার বিস্ময় ও মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হওয়া সম্ভব হবে, পাশাপাশি লাভ করা যাবে কল্পনাশক্তির বহুমুখী স্তর ছুঁয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। এসব নিয়ে বেশি ভাবি বলেই ‘কবিতাসংগ্রহ’র কবিতাগুলো আবার নতুনভাবে কাটছাঁট করছি।
আপনি এখন কী পড়ছেন?
ওই যে বললাম, বাংলাদেশের ইতিহাস লিখবার চেষ্টা করছি। এজন্য আমাকে অসংখ্য বই জোগাড় করে পড়তে হচ্ছে। একনাগাড়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায়শই হাঁপিয়ে উঠি, বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না। বলুন তো, এই বয়সে একজন গবেষকের নিষ্ঠা ও মনোযোগ মন কী করে ধরে রাখি! একদম পারি না! দ্রুতই অধৈর্য হয়ে পড়ি। তাই সময় নিচ্ছি বেশি। লেখার কাজ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তবে উপাদানগুলো জোগাড় করে রেখেছি, এই সমতল ভূমির ইতিহাস, রাজনীতি, বড় বড় ঘটনার তথ্য-উপাত্তসমৃদ্ধ অনেক বই।
এবার মূল প্রশ্নের বিষয়ে আসি। হ্যাঁ, বই পড়ি। সব মাধ্যমের লেখাই পড়ি। তবে তরুণ লেখকদের লেখা বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়ি। তাদের লেখায় চিন্তা-মনন, প্রকাশভঙ্গি ইত্যাদি জানবার, বোঝবার চেষ্টা করি। বলতে দ্বিধা নেই, তারা অনেকেই ভালো লেখেন। কারও কারওর লেখার গুণগত মান দেখে তো আমার বেশ হিংসে হয়। আমি বাধ্য হয়েই ওদের সম্মান করি।
তবে এ সত্যও প্রকাশ করা উচিত যে, আমার আত্মার সুস্থতার জন্য দরকার হয় রবীন্দ্র রচনাবলি।
সেখানে আমি অপার শান্তি খুঁজে পাই।
খবরের কাগজ সাহিত্যপাতা ‘সুবর্ণরেখা’ এগিয়ে যাক আপন ভুবনে- এই কামনাই রইল।
ধন্যবাদ আপনাকে।
সাক্ষাৎকার: হাসান হাফিজ