চৈত্রের রৌদ্রদগ্ধ দিন। বাতাসে এক ধরনের পোড়া গন্ধ। বাড়ির সামনে গড়াই নদী। অনতিদূরে ভাঁড়রা ঘাট। দুটো নৌকা সারা দিন এপার-ওপার করে। পিঁপড়ার সারির মতো দলে দলে মানুষ ঘাটে আসছে। ভোর থেকে রাত অব্দি চলে পারাপার। ঘাটের পাশে ওত পেতে বসে থাকে হাতেম মণ্ডল ও তার চেলা-চামুণ্ডারা। শরণার্থীদের সবকিছু কেড়ে নেয় তারা। হাতেম মণ্ডলের দুলাভাই পিস কমিটির লোক। সে সাহসেই ভারতগামী অসহায় মানুষের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করে হাতেম। নামকরা পল্লি চিকিৎসক সুধীর কাকা। আমরা ডাক্তার কাকা বলে ডাকি। সুধীর কাকা আমার আব্বার বন্ধু। আমাদের অসুখে-বিসুখে উনি একমাত্র চিকিৎসক। আমাদের গ্রামে এলে এক পাক ঘুরে যান আমাদের বাড়িতে। বাড়িতে এলে মা খেতে দেন। খাওয়া শেষ হলে ডাক্তার কাকা দাদির কাছে পান চেয়ে খান। ডাক্তার কাকার পুরাতন সোহরাব সাইকেল পেলে আমাকে কেউ আর ধরে বেঁধে রাখতে পারে না। সাইকেল চালানো শেখার কসরতে মেতে উঠি। এপাড়া-ওপাড়া চষে বেড়াই। আব্বা আর ডাক্তার কাকা হরিহর আত্মা। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পরপরই একদিন দুপুরে ডাক্তার কাকা আমাদের বাড়িতে এলেন। এসেই আব্বার ঘরে গিয়ে বসলেন। আমি পাশে বসে তাদের কথা শুনছি। ডাক্তার কাকা আব্বার পরামর্শ চাইলেন, এখন কী করব বুঝতে পারছি না-
আব্বা ভারী গলায় বললেন, তোমরা এখানে নিরাপদ না, ওপারে চলে যাও।
ডাক্তার কাকা গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, তাই ভাবছি। শুনলাম তোদের ঘাটের অবস্থা নাকি ভালো নেই। সবকিছু কেড়েকুড়ে নিচ্ছে। তোরা কবে যাবি?
দু-এক দিনের মধ্যে যেতে চাচ্ছি। তোর সাহায্য লাগবে।
ভয় পাস নে, চলে আয়, আমি ঘাট পার করে দেবো নে।
আব্বার অভয় বাণী শুনে ডাক্তার কাকার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। ডাক্তার কাকা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একটু বাইরে যাও বাবা। আমি উঠে বাইরে চলে এলাম। আমার কৌতূহল হলো কাকা কেন বাইরে যেতে বললেন! আমি বাইরে এসে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ডাক্তার কাকা তার ডাক্তারি ব্যাগ থেকে সাদা কাপড়ে প্যাঁচানো একটি থলি আব্বার হাতে দিলেন। থলিটা বেশ গোল গাল। সুতা দিয়ে শক্ত করে গিট দেওয়া। আব্বা থলিটা হাতে নিয়ে খাটের নিচে তৈরি করা মাইপোষে রেখে দিলেন। দ্রুত সিটকিনি লাগিয়ে বিছানা পেতে দিলেন। দুজন ফিসফিস করে কী যেন বললেন, তা আর আমার কান পর্যন্ত এল না। সচরাচর কেউ বুঝতে পারেন না খাটের নিচে একটা গোপন কুঠুরি আছে। আব্বা এটিকে মাইপোষ নাম দিয়েছেন।
আব্বা মাকে ডেকে খাবার দিতে বললেন। ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তার ওপর থরে থরে খাবার সাজিয়ে রাখলেন মা। খাবার দেখে ডাক্তার কাকা বললেন, কদিন ধরে ভালো কিছু খেতেও পারি না। এত বিপদের মধ্যে কি খাবার কথা মনে থাকে? পাড়ায় লুটপাট চলছে। আব্বা বললেন, আয় সুধীর খেয়ে নে। ডাক্তার কাকা খাট থেকে নেমে খেতে বসলেন। খেতে খেতে বললেন, যদি বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে। আমি যদি না ফিরতে পারি দুটো ছেলেকে দেখিস। ডাক্তার কাকার দুচোখে লোনা অশ্রু বয়। সে জল গাল বেয়ে ভাতের থালার ওপর পড়ে। কাকার করুন অবস্থা দেখে আব্বা হতবিহ্বল হয়ে বললেন, কাঁদিস না দোস্ত। তুই আমার কৈশোরের বন্ধু। আমার জীবন দিয়ে হলেও তোকে রক্ষা করব।
ডাক্তার কাকা উঠলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আব্বার হাত চেপে ধরে বুকে বুক ঠেকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, তোরা ভালো থাক আমিন। আমাদের জন্য সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করিস।
ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন কাকা। আব্বা মাথায় হাত রেখে স্ট্যাচুর মতো বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। কাকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথার চুলে মৃদু নাড়া দিয়ে কাকা সাইকেলে উঠে পড়লেন।
দুই দিন পরের ঘটনা। ডাক্তার কাকারা ১২-১৩ জনের একটি দল সুবেহ সাদিকের সময় আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। দাদি আর মা দ্রুত রুটি বানিয়ে একটি ব্যাগে দিয়ে দিলেন। মুড়ি আর নাড়ুও দিলেন। ফর্সা হওয়ার আগেই আব্বা আকবর মাঝিকে ডেকে নদীর ওপারে পার করে দিলেন। অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন তাদের। আব্বা বাড়িতে ফিরে এলেন। তার মনটা খুব খারাপ। শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পথে। অহরহ ছিনতাই, রাহাজানির মতো ঘটনা ঘটছে। সুযোগসন্ধানীদের বাড়বাড়ন্ত। কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আব্বা অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থাকেন। তার চোখ দুটো ঘুরেফিরে মাইপোষের ওদিকে যায়। আব্বা যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন ডাক্তার কাকার সাদা কাপড়ের থলেটি।
মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং শেষে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। লড়াই চলছে চতুর্দিকে। ধামধুম গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। মাঝে মাঝে নদীর ওপর দিয়ে বোমারু বিমান উড়ে যায়। শহরে বোম্বিং করা হয়েছে। খবর আসে ৬-৭ জন শহিদ হয়েছেন। আকাশে বিমানের শব্দ শোনামাত্র আব্বা আমাদের সবাইকে নিয়ে মাটির নিচে তৈরি করা একটি গর্তে গিয়ে বসে থাকেন। কোথাও শান্তি নেই। মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্ক। দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে দেশে। ঘরে ঘরে খাবার কষ্ট। জমিতে ভালো ফসল হয় না। রিলিফের আটা আর এক ধরনের ছাতুই ভরসা। কিছু জমানো টাকা-পয়সা ছিল আব্বার কাছে। সেসব টাকা ভেঙে খেতে খেতে শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। মিল-কলকারখানা বন্ধ। নিরুপায় অবস্থা। আব্বা ভারতে না গিয়ে দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করতে থাকেন। আমার এক ফুফাতো ভাই নদীর ওপারে মধুপুর ক্যাম্পের কমান্ডার। গভীর রাতে জেলে নৌকা করে সে আমাদের বাড়িতে আসে। মা তাদের রান্না করে খাওয়ান। একান-ওকান করে এসব খবর বাইরে আসে। পাকিস্তানি সশস্ত্র যোদ্ধারা আব্বার ওপর চরম রেগে যান। তারা বাড়িতে এসে শাসিয়ে যায়-আবার যদি মুক্তি ফৌজরা বাড়িতে আসে তোমার বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আব্বা গোপনে মধুপুর ক্যাম্পে গিয়ে ফজলু ভাইয়ের কাছে সব ঘটনা খুলে বললে ভাই বললেন, তাহলে ওদের ধরে আনি। আব্বা বললেন, তার আর দরকার নেই। তুমি বরং ওপারে আর যেও না। আব্বা চোখ মুছতে মুছতে বাড়িতে ফিরে এলেন। এসেই মাইপোষ খুলে দেখলেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে।
মাইপোষের থলের মধ্যে কী আছে মাও জানেন না। আব্বা মাকেও বলেননি কোনোদিন। এটা আমি বুঝতে পেরেছি প্রথম থেকেই। আব্বা খুব সাবধানী মানুষ। আব্বা ভালোভাবে জানতেন মেয়ে মানুষের পেটে কথা মজে না। যত গোপন কথাই হোক এর-ওর কাছে উগড়ে দেবেই। আব্বা নিজে উৎকণ্ঠায় থাকেন।
আমানতদারি বলে কথা! বাড়ি থেকে খুব বেশি বের হন না। মাঝে মাঝে ভাগনের জন্য খাবার রান্না করে গোপনে লোক মারফত মধুপুর ক্যাম্পে পাঠান। আব্বার দুই বিশ্বস্ত সহচর ইউছুপ আর ঈমান আলী খাবার সরবরাহের কাজগুলো করেন। রাতে তারা আমাদের কাচারি ঘরে ঘুমায়। এতে করে বাড়ির নিরাপত্তাও রক্ষিত হয়। তারা দুজন সাহসী আর সৎ।
কোনো কাজেই মন বসে না আব্বার। তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুত থাকে মাইপোষ। আব্বা বসে বসে যে ভাবছেন এটা আমি অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিলাম। তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার পর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মাইপোষ নিয়ে সবসময় কী ভাবো আব্বা? আমার কথা শুনে থতমত খেলেন। আমতা আমতা করে বলেন, কিছু না কিছু না। ও আচ্ছা তুই কী করে বুঝলি যে আমি মাইপোষ নিয়ে ভাবছি?
আমি জানি আব্বা।
কী! কী জানিস তুই-
ডাক্তার কাকা তোমার হাতে...
আব্বা আমার মুখ পেড়ে ধরলেন। আমি আর কথা শেষ করতে পারলাম না। রুঢ় স্বরে আব্বা বললেন কাউকে বলিসনি তো? আমি কাচুমাচু মুখে বললাম, আমি কাউকে বলিনি, আমি কাউকে বলিনি। এ ঘটনার দুই দিন পরেই বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ডের জন্ম হলো। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলো। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন আব্বা । মাইপোষ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আর। আরও এক মাস কেটে গেল। শরণার্থীরা দেশে ফিরতে শুরু করেছে। আব্বা শহরে গিয়ে ডাক্তার কাকার খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করেন। অনেকে বলেছেন, করিমপুর ক্যাম্পে ডাক্তার কাকারা ভালো আছেন। বাবা শুনে আশ্বস্ত হন। খুশি ছলকে ওঠে মুখে। জানুয়ারি মাসের এক ফুটফুটে সকাল। ডাক্তার কাকা আমাদের বাড়িতে এলেন। আব্বা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। ডাক্তার কাকার চোখে-মুখে রাজ্যের খুশি এসে ভর করল। কাকাকে সকালের নাশতা দেওয়া হলো। ১০ মাস পরে আব্বা মাইপোষ খুলে কাপড়ের থলেটা ডাক্তার কাকার ওষুধের ব্যাগে ভরে দিলেন। অবাক নয়নে একবার মাইপোষের দিকে আরেকবার থলের দিকে তাকাতে লাগলেন। ডাক্তার কাকার চোখজুড়ে বিস্ময় দেখে আব্বা বললেন, একবার তোর থলেটা খুলে দেখে নে সব ঠিকঠাক আছে কি না। ডাক্তার কাকা বিনয়ের স্বরে বললেন, আমিন আমাকে লজ্জা দিস না, তোর নামটা যে আমিন রে- আমিনের অর্থ আমি জানি! কাকার কথা শুনে আব্বার মুখে খুশির ঢেউ ছড়িয়ে যেতে দেখলাম। বংশপরম্পরায় পাওয়া খাটটির মাইপোষও যুদ্ধের স্মৃতি হয়ে রইল।