ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয় মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে পারিশ্রমিক না পেয়ে ম্যাচ বয়কট ব্রাদার্সের ক্রিকেটারদের অস্তিত্ব সংকটে হাঁড়িধোয়া নদী উত্তরবঙ্গ শিল্পোন্নত হোক দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব চাকরি দিচ্ছে ওয়ালটন, রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ক্ষুধা লাগলে মায়ের চিতায় ছুটে যান ৩ ভাই নওগাঁ সীমান্তে ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা বিএসএফের নেইমারকে ছাড়াই খেলবে ব্রাজিল সুন্দর পুরুষ টিভিতে আজকের খেলা কেমন হবে মুমিনের হজ-পরবর্তী জীবন ভূরুঙ্গামারীতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ল অর্ধশতাধিক দোকান জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়! মুন্সীগঞ্জে বিদেশি বিয়ারসহ গ্রেপ্তার ৩ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পিকআপের ধাক্কায় মা-ছেলেসহ নিহত ৩ বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণের ঘটনায় অভিযোগপত্র দাখিল বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও নির্বাচনের খরা কাটল মাসুদুজ্জামানের শান্তি নিদ্রা লালমনিরহাটের ৩ সীমান্ত দিয়ে ৩৩ জনকে পুশইনের চেষ্টা উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে ৫ লাখ ১২ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ আব্বার সেই ম্লান হাসিটা আমাকে তাড়া করে বেড়িয়েছে ডাকবাংলোয় মা-মেয়ের রহস্যজনক মৃত্যু: খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ বিশ্বকাপে নিষিদ্ধ পানির বোতল
Nagad desktop

যুদ্ধ ও মাইপোষের গল্প

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:২২ পিএম
যুদ্ধ ও মাইপোষের গল্প
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

চৈত্রের রৌদ্রদগ্ধ দিন। বাতাসে এক ধরনের পোড়া গন্ধ। বাড়ির সামনে গড়াই নদী। অনতিদূরে ভাঁড়রা ঘাট। দুটো নৌকা সারা দিন এপার-ওপার করে। পিঁপড়ার সারির মতো দলে দলে মানুষ ঘাটে আসছে। ভোর থেকে রাত অব্দি চলে পারাপার। ঘাটের পাশে ওত পেতে বসে থাকে হাতেম মণ্ডল ও তার চেলা-চামুণ্ডারা। শরণার্থীদের সবকিছু কেড়ে নেয় তারা। হাতেম মণ্ডলের দুলাভাই পিস কমিটির লোক। সে সাহসেই ভারতগামী অসহায় মানুষের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করে হাতেম। নামকরা পল্লি চিকিৎসক সুধীর কাকা। আমরা ডাক্তার কাকা বলে ডাকি। সুধীর কাকা আমার আব্বার বন্ধু। আমাদের অসুখে-বিসুখে উনি একমাত্র চিকিৎসক। আমাদের গ্রামে এলে এক পাক ঘুরে যান আমাদের বাড়িতে। বাড়িতে এলে মা খেতে দেন। খাওয়া শেষ হলে ডাক্তার কাকা দাদির কাছে পান চেয়ে খান। ডাক্তার কাকার পুরাতন সোহরাব সাইকেল পেলে আমাকে কেউ আর ধরে বেঁধে রাখতে পারে না। সাইকেল চালানো শেখার কসরতে মেতে উঠি। এপাড়া-ওপাড়া চষে বেড়াই। আব্বা আর ডাক্তার কাকা হরিহর আত্মা। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পরপরই একদিন দুপুরে ডাক্তার কাকা আমাদের বাড়িতে এলেন। এসেই আব্বার ঘরে গিয়ে বসলেন। আমি পাশে বসে তাদের কথা শুনছি। ডাক্তার কাকা আব্বার পরামর্শ চাইলেন, এখন কী করব বুঝতে পারছি না-
আব্বা ভারী গলায় বললেন, তোমরা এখানে নিরাপদ না, ওপারে চলে যাও। 

ডাক্তার কাকা গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন, তাই ভাবছি। শুনলাম তোদের ঘাটের অবস্থা নাকি ভালো নেই। সবকিছু কেড়েকুড়ে নিচ্ছে। তোরা কবে যাবি? 

দু-এক দিনের মধ্যে যেতে চাচ্ছি। তোর সাহায্য লাগবে। 
ভয় পাস নে, চলে আয়, আমি ঘাট পার করে দেবো নে। 
আব্বার অভয় বাণী শুনে ডাক্তার কাকার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। ডাক্তার কাকা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি একটু বাইরে যাও বাবা। আমি উঠে বাইরে চলে এলাম। আমার কৌতূহল হলো কাকা কেন বাইরে যেতে বললেন! আমি বাইরে এসে জানালার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম। ডাক্তার কাকা তার ডাক্তারি ব্যাগ থেকে সাদা কাপড়ে প্যাঁচানো একটি থলি আব্বার হাতে দিলেন। থলিটা বেশ গোল গাল। সুতা দিয়ে শক্ত করে গিট দেওয়া। আব্বা থলিটা হাতে নিয়ে খাটের নিচে তৈরি করা মাইপোষে রেখে দিলেন। দ্রুত সিটকিনি লাগিয়ে বিছানা পেতে দিলেন। দুজন ফিসফিস করে কী যেন বললেন, তা আর আমার কান পর্যন্ত এল না। সচরাচর কেউ বুঝতে পারেন না খাটের নিচে একটা গোপন কুঠুরি আছে। আব্বা এটিকে মাইপোষ নাম দিয়েছেন। 

আব্বা মাকে ডেকে খাবার দিতে বললেন। ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তার ওপর থরে থরে খাবার সাজিয়ে রাখলেন মা। খাবার দেখে ডাক্তার কাকা বললেন, কদিন ধরে ভালো কিছু খেতেও পারি না। এত বিপদের মধ্যে কি খাবার কথা মনে থাকে? পাড়ায় লুটপাট চলছে। আব্বা বললেন, আয় সুধীর খেয়ে নে। ডাক্তার কাকা খাট থেকে নেমে খেতে বসলেন। খেতে খেতে বললেন, যদি বেঁচে থাকি আবার দেখা হবে। আমি যদি না ফিরতে পারি দুটো ছেলেকে দেখিস। ডাক্তার কাকার দুচোখে লোনা অশ্রু বয়। সে জল গাল বেয়ে ভাতের থালার ওপর পড়ে। কাকার করুন অবস্থা দেখে আব্বা হতবিহ্বল হয়ে বললেন, কাঁদিস না দোস্ত। তুই আমার কৈশোরের বন্ধু। আমার জীবন দিয়ে হলেও তোকে রক্ষা করব। 

ডাক্তার কাকা উঠলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আব্বার হাত চেপে ধরে বুকে বুক ঠেকালেন। গম্ভীর গলায় বললেন, তোরা ভালো থাক আমিন। আমাদের জন্য সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করিস। 

ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন কাকা। আব্বা মাথায় হাত রেখে স্ট্যাচুর মতো বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। কাকার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথার চুলে মৃদু নাড়া দিয়ে কাকা সাইকেলে উঠে পড়লেন।

দুই দিন পরের ঘটনা। ডাক্তার কাকারা ১২-১৩ জনের একটি দল সুবেহ সাদিকের সময় আমাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হলেন। দাদি আর মা দ্রুত রুটি বানিয়ে একটি ব্যাগে দিয়ে দিলেন। মুড়ি আর নাড়ুও দিলেন। ফর্সা হওয়ার আগেই আব্বা আকবর মাঝিকে ডেকে নদীর ওপারে পার করে দিলেন। অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন তাদের। আব্বা বাড়িতে ফিরে এলেন। তার মনটা খুব খারাপ। শহরে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পথে। অহরহ ছিনতাই, রাহাজানির মতো ঘটনা ঘটছে। সুযোগসন্ধানীদের বাড়বাড়ন্ত। কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আব্বা অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থাকেন। তার চোখ দুটো ঘুরেফিরে মাইপোষের ওদিকে যায়। আব্বা যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখেন ডাক্তার কাকার সাদা কাপড়ের থলেটি।
মুক্তিযোদ্ধারা ট্রেনিং শেষে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। লড়াই চলছে চতুর্দিকে। ধামধুম গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। মাঝে মাঝে নদীর ওপর দিয়ে বোমারু বিমান উড়ে যায়। শহরে বোম্বিং করা হয়েছে। খবর আসে ৬-৭ জন শহিদ হয়েছেন। আকাশে বিমানের শব্দ শোনামাত্র আব্বা আমাদের সবাইকে নিয়ে মাটির নিচে তৈরি করা একটি গর্তে গিয়ে বসে থাকেন। কোথাও শান্তি নেই। মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্ক। দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে দেশে। ঘরে ঘরে খাবার কষ্ট। জমিতে ভালো ফসল হয় না। রিলিফের আটা আর এক ধরনের ছাতুই ভরসা। কিছু জমানো টাকা-পয়সা ছিল আব্বার কাছে। সেসব টাকা ভেঙে খেতে খেতে শেষ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। মিল-কলকারখানা বন্ধ। নিরুপায় অবস্থা। আব্বা ভারতে না গিয়ে দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করতে থাকেন। আমার এক ফুফাতো ভাই নদীর ওপারে মধুপুর ক্যাম্পের কমান্ডার। গভীর রাতে জেলে নৌকা করে সে আমাদের বাড়িতে আসে। মা তাদের রান্না করে খাওয়ান। একান-ওকান করে এসব খবর বাইরে আসে। পাকিস্তানি সশস্ত্র যোদ্ধারা আব্বার ওপর চরম রেগে যান। তারা বাড়িতে এসে শাসিয়ে যায়-আবার যদি মুক্তি ফৌজরা বাড়িতে আসে তোমার বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। আব্বা গোপনে মধুপুর ক্যাম্পে গিয়ে ফজলু ভাইয়ের কাছে সব ঘটনা খুলে বললে ভাই বললেন, তাহলে ওদের ধরে আনি। আব্বা বললেন, তার আর দরকার নেই। তুমি বরং ওপারে আর যেও না। আব্বা চোখ মুছতে মুছতে বাড়িতে ফিরে এলেন। এসেই মাইপোষ খুলে দেখলেন। সবকিছু ঠিকঠাক আছে। 

মাইপোষের থলের মধ্যে কী আছে মাও জানেন না। আব্বা মাকেও বলেননি কোনোদিন। এটা আমি বুঝতে পেরেছি প্রথম থেকেই। আব্বা খুব সাবধানী মানুষ। আব্বা ভালোভাবে জানতেন মেয়ে মানুষের পেটে কথা মজে না। যত গোপন কথাই হোক এর-ওর কাছে উগড়ে দেবেই। আব্বা নিজে উৎকণ্ঠায় থাকেন। 

আমানতদারি বলে কথা! বাড়ি থেকে খুব বেশি বের হন না। মাঝে মাঝে ভাগনের জন্য খাবার রান্না করে গোপনে লোক মারফত মধুপুর ক্যাম্পে পাঠান। আব্বার দুই বিশ্বস্ত সহচর ইউছুপ আর ঈমান আলী খাবার সরবরাহের কাজগুলো করেন। রাতে তারা আমাদের কাচারি ঘরে ঘুমায়। এতে করে বাড়ির নিরাপত্তাও রক্ষিত হয়। তারা দুজন সাহসী আর সৎ।

কোনো কাজেই মন বসে না আব্বার। তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুত থাকে মাইপোষ। আব্বা বসে বসে যে ভাবছেন এটা আমি অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ করছিলাম। তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার পর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, মাইপোষ নিয়ে সবসময় কী ভাবো আব্বা? আমার কথা শুনে থতমত খেলেন। আমতা আমতা করে বলেন, কিছু না কিছু না। ও আচ্ছা তুই কী করে বুঝলি যে আমি মাইপোষ নিয়ে ভাবছি? 
আমি জানি আব্বা। 
কী! কী জানিস তুই-
ডাক্তার কাকা তোমার হাতে...
আব্বা আমার মুখ পেড়ে ধরলেন। আমি আর কথা শেষ করতে পারলাম না। রুঢ় স্বরে আব্বা বললেন কাউকে বলিসনি তো? আমি কাচুমাচু মুখে বললাম, আমি কাউকে বলিনি, আমি কাউকে বলিনি। এ ঘটনার দুই দিন পরেই বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ডের জন্ম হলো। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলো। হাফ ছেড়ে বাঁচলেন আব্বা । মাইপোষ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আর। আরও এক মাস কেটে গেল। শরণার্থীরা দেশে ফিরতে শুরু করেছে। আব্বা শহরে গিয়ে ডাক্তার কাকার খোঁজখবর নিতে চেষ্টা করেন। অনেকে বলেছেন, করিমপুর ক্যাম্পে ডাক্তার কাকারা ভালো আছেন। বাবা শুনে আশ্বস্ত হন। খুশি ছলকে ওঠে মুখে। জানুয়ারি মাসের এক ফুটফুটে সকাল। ডাক্তার কাকা আমাদের বাড়িতে এলেন। আব্বা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। ডাক্তার কাকার চোখে-মুখে রাজ্যের খুশি এসে ভর করল। কাকাকে সকালের নাশতা দেওয়া হলো। ১০ মাস পরে আব্বা মাইপোষ খুলে কাপড়ের থলেটা ডাক্তার কাকার ওষুধের ব্যাগে ভরে দিলেন। অবাক নয়নে একবার মাইপোষের দিকে আরেকবার থলের দিকে তাকাতে লাগলেন। ডাক্তার কাকার চোখজুড়ে বিস্ময় দেখে আব্বা বললেন, একবার তোর থলেটা খুলে দেখে নে সব ঠিকঠাক আছে কি না। ডাক্তার কাকা বিনয়ের স্বরে বললেন, আমিন আমাকে লজ্জা দিস না, তোর নামটা যে আমিন রে- আমিনের অর্থ আমি জানি! কাকার কথা শুনে আব্বার মুখে খুশির ঢেউ ছড়িয়ে যেতে দেখলাম। বংশপরম্পরায় পাওয়া খাটটির মাইপোষও যুদ্ধের স্মৃতি হয়ে রইল।

বই পরিচিতি দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন
বই

ইউসুফ হাসান অর্ক

শ্রেণি: সমকালীন লোককাহিনি

প্রকাশনী: বাংলা একাডেমি

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নাট্যমূলক পরিবেশনার অগাধ ভাণ্ডার বিবেচনার ক্ষেত্রে আমাদের মগ্নতায় এখনো দাসত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে সংলাপমূলক দ্বন্দ্ব দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তথাকথিতদৃশ্যকাব্যহয়ে উঠলেই তাকে বলা যাবেবিশ্বমানের নাটকীয় কিছু হলো’- ভাবনার বাইরে গিয়ে দেশজ সম্পদের স্বকীয় ঐশ্বর্যের দ্যোতনাকে যে কয়জন মানুষ উপলব্ধি করে উদ্যোগী হয়েছিলেন তার মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম সারির তারই হাত ধরে এসব ঐশ্বর্যেরনাগরিকসমাজে প্রবেশ বলা যায় নগরমঞ্চে এদের পরিবাহন সে সময় থেকেই তার পর থেকে নানা মাধ্যমে পরিবাহন প্রক্রিয়া কখনো স্তিমিত, কখনো বা জোরালো গতিতে অব্যাহত রয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে লোককাহিনিগুলো পরিবাহনের আরেকটি মাত্রা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নগরকেন্দ্রিক থিয়েটার মঞ্চে কাহিনিগুলো ঐতিহ্য প্রণোদিত অথচ নতুন রীতিতে মঞ্চায়িত হতে শুরু করে লোককাহিনি পরিবাহনের পাশাপাশি অভিনয়রীতি নিরীক্ষার এক বি-ঔপনিবেশিক প্রতিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা চলে ধরনের উদ্যোগগুলোকে পাশাপাশিসাংস্কৃতিক পরিবাহন’-এর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেও এগুলোকে বিবেচনা করা অসমীচীন নয় তাই দীনেশচন্দ্র সেনকে প্রণতি জানিয়ে লোককাহিনি পরিবাহনের এক সমকালিক প্রবণতাকে গ্রন্থে স্বীকৃতি দেওয়া গেছে লোকজ ধারার সাহিত্য পরিবেশনায়ফুইডিটি যে উদার প্রশ্রয়, তাকে গ্রহণ করে নগরকেন্দ্রিক পরিবাহন-প্রক্রিয়া তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থটিতে লোককাহিনিনির্ভর তিনটি নাট্য প্রযোজনার সমুদয় বিশ্লেষণ থেকে সমকালে লোককাহিনির পরিবাহন নিরীক্ষা বিষয়ে ধারণা অর্জন সম্ভবফোকলোর’, ‘পারফরম্যান্স স্টাডিজনাট্যকলাবিষয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-নির্দেশকদের জন্যও গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

সমাজবোধ ও জীবনবীক্ষা মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৩২ পিএম
মোস্তফা কামালের বিষাদ বসুধা

চতুর্থ পর্ব

মাঝে পড়ালেখার কারণে শাহবাজ খানের বিদেশ অবস্থান, তাদের মধ্যে সেই সময়ে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটেনি। যোগাযোগও ছিল না। করোনাকালীন তাদের মধ্যে হুট করেই আবার যোগাযোগ স্থাপন হয়। শাহবাজ খান ধনীপুত্র। নিজেও পিতার শিল্পসাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। মোহিনীও শিল্পদ্যোক্তা, ধনী ব্যবসায়ী। আরেফিনের মৃত্যুর পরে  মোহিনীর জীবনে শাহবাজ খান আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্তু মোহিনী অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুকৌশলে শাহবাজ খানের ফাঁদে পা দেননি। বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘন করেননি। করতেও দেননি। আরেফিন মৃত্যুবরণ করলেও মোহিনীর মস্তিষ্কের কোষে কোষে বেঁচে আছে আরেফিন। তার সঙ্গে যাপিত অসংখ্য স্মৃতি মোহিনী নিজের ভেতর লালন করেন। আরেফিন না থেকেও পুরো আরেফিনই তার জীবনে জীবন্ত হয়ে আছে। সেখান থেকে মোহিনীর মুক্তি ঘটেনি, মুক্তি ঘটাতে চানওনি। মোহিনীর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা ও সততা তার চরিত্রকে উচ্চমার্গের করেছে। শাহবাজ খানের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু যখন তিনি জানলেন শাহবাজ খানের সঙ্গে রুবিনা নাম্মী এক কলেজছাত্রীর অনৈতিক সম্পর্ক ছিল। রুবিনাকে গুলশানে নিজে বাসা ভাড়া করে রাখতেন। রক্ষিতার মতো। অনেকটা ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র জমিদার গোবিন্দলাল আর রোহিনীর অবস্থা। গোবিন্দলাল রোহিনাকে বিয়ের আশ্বাসে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে বিয়ে তো করেইনি, গুলি করে হত্যা করেছিল। রুবিনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনাই ঘটেছে। একালের ‘জমিদার’ শাহবাজ খান বিয়ের আশ্বাসে রুবিনাকে রক্ষিতা করে রেখেছিল এবং শেষে হত্যা করেছে। রুবিনার মনে রোহিনীর মতোই আশা ছিল স্বপ্ন ছিল শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করবে, তার সংসার হবে, সন্তান হবে। কিন্তু শাহবাজ খান ছিলেন পুরোটাই ভোগবাদী মানসিকতাসম্পন্ন। সে কারণে একপর্যায়ে রুবিনাকে হত্যা করে সে। রুবিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল। অর্থাৎ ভ্রুণসহ হত্যার শিকার হয় রুবিনা। এটা মোহিনী জানার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অফিসে জানিয়ে দেন, শাহবাজ খান যেন তার অফিসে কখনোই আসতে না পারে। তার জন্য এ অফিস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। মোহিনীর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ করে। কারণ তিনি রুবিনার বিষয় নিয়ে শাহবাজ খানের সঙ্গে কোনো কথা বলা বা আলোচনা করারই প্রয়োজন মনে করেননি। এরকম একজন নষ্টকীটের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব থাকতে পারে না, কোনোরকম আর যোগাযোগ হতে পারে না। তিনি মুহূর্তেই মানসিক দৃঢ়তা, সততা ও আদর্শে এরকম কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পেরেছেন। অথচ শাহবাজ খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছোটবেলা থেকে। শাহবাজ খান তাকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরুর কথা সরাসরি বলেছে। যা বিনয়ের সঙ্গে মোহিনী প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের জায়গাটি তো তাদের মধ্যে ছিল। শাহবাজ খানের রুবিনা হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা জানার পরই তিনি মুহূর্তেই তার জীবন থেকে শাহবাজ খানকে উপড়ে তুলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব কতটা শক্তিশালী হলে মুহূর্তেই দীর্ঘদিনের বন্ধুকে এভাবে ছুড়ে ফেলতে পারা যায়, তা সহজেই অনুমিত হতে পারে। এখানে শাহবাজ খানের অর্থ-ক্ষমতা-বন্ধুত্ব কোনো কিছুই মুহূর্তের জন্যও মোহিনীকে ভাবাতে পারেনি। মোহিনী এমনই এক নির্লোভ, নির্মোহ, সত্যের ও আদর্শের ধারক হয়ে ওঠেন।

মোহিনীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আসিফ আহমেদ। প্রখ্যাত সাংবাদিক তিনি। মোহিনীর আসিফ আহমেদের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে মানসিক দুর্বলতা থাকলেও কখনো তা প্রকাশ করেননি। বন্ধুত্বকে অতিক্রম করে অন্য কোনো সম্পর্কে আগাননি। আসিফ আহমেদকে তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। তার পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চয়েছেন। এমনকি আসিফ আহমেদকে মাথায় রেখেই পত্রিকা প্রকাশনার কথাও ভেবেছেন। আসিফ আহমেদ তাকে না জনিয়ে অনলাইন পত্রিকা ‘ঢাকাপ্রকাশ’ করলে মোহিনীর কণ্ঠে অভিমান ও অনুযোগের প্রকাশ ঘটেছে। বন্ধুত্বের প্রতি তার যে সম্মান ও দায়িত্ববোধ তা অসাধারণ। আসিফ আহমেদ বন্ধুত্বের সীমানা কখনোই অতিক্রম করেননি। তার শান্ত-স্নিগ্ধ কিন্তু ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব ও আত্মসম্মানবোধ মোহিনীকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। বন্ধু হয়েও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আত্মসস্মানবোধ এবং হৃদয়গত উপলব্ধি- মোহিনী চরিত্রে অপূর্ব সুঘ্রাণ তৈরি করেছে। আরেফিনের দরিদ্র পরিবারের প্রতি তার যে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ তা বাঙালি নারীর চিরকালীন যে ব্যক্তিক-সৌন্দর্য ও দায়িত্ববোধ তা চমৎকারভাবে লেখক তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটা টানেই জীবন্ত করে এঁকেছেন। আরেফিনের বাবা আলী আকবর যখন অফিসে এসে মোহিনীকে না পেয়ে ফিরে গেছেন, রেখে গেছেন অসহায় আকুতিভরা পত্র, সেই পত্র পড়ে মোহিনীর ভেতর যে মানসিক কষ্ট-যন্ত্রণা হয়েছে, নিজের ভেতর বেদনার্ত আর্তনাদ হয়েছে, মানসিক কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। অফিসের কর্মকর্তার প্রতি তার এ বিষয়ে নির্মোহ আচরণ এবং দ্রুত দ্বিগুণ পরিমাণে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এর ভেতর দিয়ে মানবিক ও দায়িত্বশীল মোহিনীকে পাই। বাঙালির নারীর জীবনে স্বামী-পরিবার যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা মোহিনী চরিত্রে পরিলক্ষিত হয়। তিনি ধনীকন্যা। নিজেও ধনী শিল্পোদ্যোক্তা। স্বামী মৃত। নিজে কখনো শ্বশুরবাড়ি যাননি। তিনি অনায়াসে এসব এড়িয়ে চলতে পারতেন। তিনি তা করেননি। বরং আরেফিনের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবারের দায়িত্ব বহন করছেন। তিনি জানেন আরেফিনের টাকাতেই সংসার চলত। আরেফিনের মৃত্যুতে পরিবারটা অসহায়। তাই তিনি নিজেই বাড়ির যেন পুত্রবধূ নয়, নিজেই সংসারের দায়িত্ব পালনে আরেফিন হয়ে ওঠেন। মোহিনী যেন ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রমীলাকেই মনে করিয়ে দেয়। স্বামী মেঘনাদ যখন বিপদগ্রস্ত তখন তিনি চুপ থাকতে পারেননি। তিনি মুহূর্তেই যুদ্ধসাজে তৈরি হয়ে স্বামী মেঘনাদকে উদ্ধারের জন্য ছুটে গেছেন। মোহিনীর প্রেক্ষিত ভিন্ন। কিন্তু দায়িত্বের জায়গা অনেকখানিই এক। বিশেষ করে বাঙালি নারীর কাছে স্বামীর পরিবার বিপদগ্রস্ত হওয়া মানে সে বিপদ তার নিজেরই। সেখানে তার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার উপায় নেই। শ্বশুরবাড়ির প্রতি বাঙালি নারীর হৃদয়সত্য ও দায়িত্ববোধে মোহিনী চরিত্র অসামান্য হয়ে উঠেছে।

মোহিনী দেড় বছরের ব্যবধানে বাবা মোহসীন আহমেদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে হারিয়ে দিশেহারা। বাবা মৃত্যুর আগে স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও কন্যা মোহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে ‘আনোয়ারা-মোহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন। মোহিনী সে ট্রাস্টের প্রধান। নিজের কোম্পানিও ট্রাস্টের অন্তর্ভুক্ত করেন। যাতে তাদের মৃত্যুর পরে কোম্পানিগুলো কোনো সমস্যার শিকার না হয়ে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে। ট্রাস্ট থেকে মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রকাশনাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। করোনায় বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেন। কারণ তিনি জানেন মৃত্যু অবধারিত। আরেফিন ও বাবা-মায়ের মতো একদিন তাকেও চলে যেতে হবে। সে কারণে উপার্জিত অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। ব্যক্তি মোহিনী নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের অসহায় মানুষের কথা। নিজেকে নিজেই অতিক্রম করার অসাধারণ চরিত্র মোহিনী।

উপন্যাসের মোহিনীর গুরুত্ব বিবেচনা করে যে বিষয়টি ভাবনায় আসে তা হলো, প্রধান চরিত্র মোহিনী হওয়া সত্ত্বেও কিছু অধ্যায়ে মোহিনীবাদেই স্বতন্ত্র গতিতে এগিয়েছে।   

চলবে...

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।

কবিতা জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪২ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

আমরা কি বেঁচে আছি?
বেঁচে নেই আমাদের ভালোবাসাও!
কে বলেছে ভালোবাসা একবার
হয়। কতো গভীর সম্পর্কও একদিন
হয়ে যায় ফিকে।
হয়তো কিছু একটা আঁকড়ে ধরে
বাঁচার চেষ্টা ভালো থাকার অভিনয়।
এভাবে জীবন একদিন শেষ হয়ে
যায়। জীবন বহতা নদীর মতো 
বয়ে চলে অবিরাম।
যেখানে তার উৎপত্তি সে ফিরে
আসে না কখনো সেখানে, প্রতিনিয়ত
ছুটে চলে সাগরের পানে মিশবে বলে।
কিছু ভালোবাসা চরম ভুল।
সুনামির চেয়েও ভয়ংকর, আবেগ
কিংবা কিছুটা মোহ। মোহ কেটে
গেলে সব শেষ। মনের হদিস কেউই
জানে না। মনের বন্ধ দরজা আর
খোলা যায় না একজীবনেও। কিছু
স্মৃতিও একদিন বিস্মৃতির আড়ালে
চলে যায়। জীবনের সকাল, দুপুর,
সন্ধ্যা! রাত্রি শেষে আর জীবনের
সকাল হয় না, যত আকুতি জানানো
হোক না-কেন। জীবনের কিছু পথে দুবার
হাঁটা হয় না এবং  যায়ও না। মানুষ সময়ের
সাথে বদলে যায়। এভাবে চলতে
চলতে জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়।

কবিতা বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৫ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বিষাদ-বেদনার আঙুলে চুমো খাও
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

 মিরাজ নিজের দুই ঠোঁটে চুমো খাও।
নিজকে জড়িয়ে ধরে বলো 
আই লাভ ইউ।
যে আঙুলে জমা পড়েছে বিষাদ-বেদনা 
সেই আঙুলকে আদর করো।

মিরাজ, কে তোমাকে কথা দিয়েছিল? 
কে কথা রাখেনি! 
এই সব হাওয়া-বাতাসের মন্ত্র ভুলে গিয়ে 
বুকের ভেতরে সৃষ্টি করো আদম বাগান।
যে হাত স্পর্শ করেছে অবৈধ নারীর আঙুল 
সে হাতকে কালেমা পড়িয়ে মানুষ বানাও।

মিরাজ, আদম-হাওয়া-গন্দমের ইতিহাস ভুলে যাও।
নিজেকে বিষণ্ণ বৃক্ষের মতো মনে করো না।
আজ থেকে প্রবেশ করো আঙুর ফলের বাগানে।
দুই ঠোটের মাঝখানে জমে থাকা বিষকে পরিণত করো মধুতে।
চোখের খুনপাখিকে লালনের গান শোনাও।