ঊর্মির জন্য সুশান্তর মনটা কখনো কখনো দোল খায়। আর সেই বাড়িটাও ভীষণভাবে টানে তাকে। তখনকার এতটুকুন ঊর্মির দায়িত্ববোধ ভালো লাগত ওর। চা দিতে দিতে সুশান্তকে একাকী পেলে বা সুযোগ পেলেই বলত, ‘টাকার অভাবে মনে হয় আর পড়াশোনা হবে না সুশান্তদা।’ হয়তো ওর কাছে ভরসার জায়গাটি যেন খুঁজে পেত ঊর্মি! কর্মজীবন মানুষকে কীভাবে রোবট করে তোলে এটা নিজের কর্মধারার সিঁড়িগুলো দিয়ে অনুধাবন করেছে সুশান্ত। পুরুষের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায় নিরাপদ অর্থের সন্ধান করতে। যখন অর্থবিত্তে টইটম্বুর হয় তখন মানুষ নিরাপদ শান্তি খোঁজে। এখন অর্থবিত্তে টইটম্বুর সুশান্ত নিজেও। পাঁচতারকা হোটেল থেকে ঘুরেফিরে যেখানে এসে দাঁড়াল, এটি নারিন্দা চৌরাস্তার মোড়, পুরান ঢাকা। এ জায়গাটা ওর চেনা। বিকেল চারটে থেকে খোঁজাখুঁজি, এখন পাঁচটা বেজে চল্লিশ। কেউই ঠিকানাটা সঠিকভাবে বলতে পারছে না, কারণ, দেড় দশকে এ রোডের বাড়িগুলোয় বিরাট ওলটপালট হয়েছে।
পকেট থেকে নিজহাতে লেখা টুকরো কাগজটি আবারও বের করল সুশান্ত। চোখ বুলিয়ে নিল- ১৯/১৯/১ শরৎগুপ্ত রোড। পুরান ঢাকার এ ঠিকানায় কত আড্ডা হয়েছে, রাত কেটেছে, গান শুনিয়েছে শিশির। দুর্দান্ত কবিতা লিখত। হরিহর আত্মা ছিল, আহা কী সুরেলা গলা! স্কুলজীবন একসঙ্গে কাটালেও কলেজে পা দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই গ্রামের নিঃসন্তান এক রমণীকে মা বানিয়ে প্রথমে চলে গেল ইংল্যান্ড। পরে সেখান থেকে কানাডা চলে গেল সুশান্ত। আর শরৎগুপ্ত রোডেই পড়ে থাকতে হয়েছিল শিশির কুমার রায় চৌধুরীকে। কী-ই বা বয়স তখন, হয়তো উনিশ-কুড়ি ওর।
তখন এ মহল্লায় ফাঁকা-ফাঁকা একতলা-দোতলা বাড়ি ছিল। কিন্তু সেসব নমুনার দোকান-বাড়ির চিহ্ন আশপাশে নেই এখন। বরং পনেরো বছরে বদলে গেছে, ঘরবাড়ি-দোকানপাট। এখন রাস্তার ডানপাশে সারবাঁধা বড়দোকান কয়েকটি, এরপর স্মার্ট ফোন রিচার্জের দুটি মাঝারি দোকান, টাঙানো বেলুন ওড়াউড়ি করছে। কিছু দোকানে পটেটো ক্রেকার, লেইজ চিপস, বিভিন্ন কোম্পানির চানাচুরের প্যাকেট ঝুলছে।
২. ছক করে ট্যুর সাজিয়েছিল সুশান্ত। পনেরো বছর কানাডা কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল- দিল্লি ট্যুর সেরে আনন্দফূর্তিতে ঢাকা কাটাবে এক মাস।
ড্রিংকসের পাগল ছিল শিশির। র মদ খেতে পছন্দ করত ও। রথকলা মোড়ে লোকেল লিকারের দোকান থেকে দীনেশ জোগাড় করত সোমরস। ওর পরিবারে ভয়ংকর রকম ঝামেলা ছিল, দারিদ্রতা ছিল নিত্যসঙ্গী। বেশিদিন আগের কথা কি? স্মৃতির দরজা খুলে যায় সুশান্তর। আঙুলে গুনে দেখল- দিন একেবারে কম হয়নি। নিজেই এবার সাঁইত্রিশে পড়ল। শক্তসামর্থ্য শরীর দেখে সুশান্তকে অনুমান করা কঠিন হলেও রাজপুত্র টাইপের চেহারার আড়ালে অনেক দুঃখ তো ছিলই। সেসব দিনের কথা এমনভাবে চোখে ভেসে ওঠে- যেন এই তো সেদিনের কাণ্ড। রাসপূর্ণিমা ছিল। পুরান ঢাকার রথখোলা থেকে ফিরে এসে বন্ধুসম ছোটভাই দীনেশ বলল, ‘মদের দোকানি বাকিতে মাল দেবে না, দাদা।’
শিশির তো অবাক। ‘বলিস কী, তুই বুঝিয়ে বলিসনি?’
কাঁচুমাচু খেয়ে দীনেশ বলল, ‘কতভাবে বলেছি, ইনিয়ে-বিনিয়ে বলেছি গো, ওদের এককথা, ম্যালা বাকি জমে গ্যাছে, বলল কী, মদ কি কেউ বাকি বেচে রে?’
‘বলিস কী, মদ বলবে কেন? বলবে মদ নয়, সোমরস। স্বয়ং ঠাকুরের প্রসাদ, প্রভুর আশীর্বাদ।’
শিশির রেগেমেগে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। উচ্চকণ্ঠে বলল, ‘দাঁড়া, ভূতেরা টাকা জোগাবে।’
ঘর থেকে ফিরে এসে কিছুক্ষণ পর চেয়ারে দুপা উঠিয়ে শিশির মাথা ঝাঁকাল কয়েক মিনিট। লম্বা টান দিয়ে মুখভরে বকমার্কা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল। এরপর আস্তে আস্তে বলল, ‘কী রে, দীনেশ বাজারের টাকাটা খরচ করা কি ঠিক হবে?’
কথা শেষ না হতেই ভেতর ঘরে নারী কণ্ঠে তীব্র আপত্তি।
‘কুনুভাবেই টাকাটা ভাঙব না, ছাইপাস খেয়ে তো তুই রাতে এসে শুয়ে থাকিস? তুই তো শনি হইচস। এ্যাই সংসার কীভাবে চলে জানিস? জানিস না! মরবিও না!’
বোঝা গেল ভেতর ঘর থেকে আসা উচ্চকণ্ঠ শিশিরের মায়ের। হঠাৎ শোনা গেল, ঊর্মির কণ্ঠের আওয়াজ। ‘রোজদিন ঘ্যানর ঘ্যানর ভাল্লাগে না।’
সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল ও। স্কুলের বেতন দিতে না পারায় সাময়িক বন্ধ পড়াশোনা। অসাধারণ সুন্দর চেহারা, মায়াময় চোখ ছিল। ড্রইং রুম থেকে শোনা গেল মায়ের রাগি কণ্ঠ, ‘ওরে কবিতায় ভাত দিব?’
ঊর্মি বুঝতে পারে মায়ের কথাগুলো ওর শিশিরদাকেই উদ্দেশ করে বলা। তবু বলল, ‘কার কথা বলো মা?’ মা উল্টো ঊর্মিকে বললেন, ‘তুই মরতে পারিস না।’
‘মরব ক্যান?’ পাল্টা জবাব ঊর্মির।
‘মইরা আমারে বাঁচা। ডাঙর অইতাচস। বিয়া দিতে খরচা আছে না? পামু কই?’
শিশিরের মা চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। সবকিছু কয়েক মিনিটের জন্য নীরব।
এরপর গরগরে গলায় শিশিরের মা বললেন, ‘আর পারি না, একে তো সংসার চলে না, এরপর নতুন নতুন বই-কলম। দুইটা দিন যায় নাই, কলম খেয়ে ফেলছিস। কাম তো উল্টা হইছে, তোদের বাপ মরল ক্যান, আমারে যমে দেখে নাই?’
‘না, দেখে নাই।’ ঊর্মির অন্তঃসারশূন্য কণ্ঠ।
‘আমার বাপে উচ্চবংশ দেইখা বিয়া দিল, উচ্চবংশ! থুক্ দিই, থুক্। জাতবংশে ভাত দিল?’ শিশিরের মায়ের ক্রুদ্ধ কণ্ঠ, ভীষণ চড়া।
কিছুক্ষণ শব্দহীন, আবার কিছু কথা, কখনো বিড়বিড়, কখনো আস্তে আস্তে। অস্পষ্ট, উড়ে উড়ে, ভেসে ভেসে কথা শোনা যায় শিশিরের মায়ের নারী কণ্ঠে।
হঠাৎ উচ্চকণ্ঠ। শিশিরের উদ্দেশে তার মা বলছেন, ‘মইরা আমারে মুক্তি দিলেই তো পারে। কিন্তু মরবে না। কবিতা রচনা করে, আকাশ নিয়া কবিতা, বৃক্ষ নিয়া কবিতা, বাতাস নিয়া কবিতা, আহারে কবিতা! গান করে, এইসবে ভাত দেবে?’
বিনয়ের সঙ্গে শিশির বলল, ‘মা, কবিতা লিখলে কী দোষ, কও?’
‘ধুর, খেতা মারি তর কবিতার!’
সুশান্তর চোখের ওপর সেসব দৃশ্য ভেসে ওঠে। সে মনে করার চেষ্টা করে সেদিনকার ঊর্মির কথা। অসাধারণ সুন্দর ছিল ঊর্মির চোখজোড়া। নাদুস-নুদুস, কিশোরী। পর্দা ঠেলে আড়চোখে তাকাত সবার দিকে। ফুটফুটে সবুজ-ফুল-লতাপাতার ফ্রক। কানাডা থেকেই সুশান্ত শুনেছিল এসএসসি পরীক্ষার পরই ঊর্মি পাশের বাড়ির মুসলিম ছেলের সঙ্গে পালিয়েছিল। পুরোপুরি তিন মাসও সংসার টেকেনি। দেহমন উজাড় করে দিলেও বর তাকে ঠকিয়েছিল। কেন, কোথায়, কীভাবে এসবের বিস্তারিত জানা হয়নি। হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়ায় পরবর্তীকালে ঊর্মির পাত্র জোটা মুশকিল হয়। ফলে বিয়েও হয়নি। অবশ্য, এখন কী করে ঊর্মি এটা জানে না সুশান্ত।
শিশিরদের চমকে দেওয়ার বাসনা ছিল আজ, এজন্যই শরৎগুপ্ত রোডে এতদিন পর পা দেওয়া। বিয়ে-সাদি করেছে কি না, ছেলেমেয়ে কটা, কী করে বাচ্চারা। অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী শিশিরের পাগলামি কী এখন আছে! চমৎকার কবিতা লিখত, এগুলো আবার নিজেই কণ্ঠে তুলত, সুর করত। ওর বউ কেমন! ওর কাণ্ড কারখানা মেনে নিয়েছে তো?
৩. নারিন্দা রোডে পাশ ঘেঁষে একটি পুরোনো টয়োটা করোলা কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সড়কের ধুলা উড়িয়ে যাচ্ছিল। আস্তে আস্তে বৃদ্ধ উচ্চারণ করলেন, ‘ধৈর্য নাই, হুল্লুক কোথাকার।’
বৃদ্ধ মুখ ঘুরিয়ে এদিকে তাকাতেই হাতের চিরকুট বাড়িয়ে সুশান্ত বলল, ‘এক্সকিউজ মি, এই বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন?’
‘ও আচ্ছা, এইটা শরৎগুপ্ত রোড আগে ছিল। এখন মনির হোসেন লেন। মহল্লার নাম পাল্টাইয়া গ্যাছে। এ্যাইখানকার বিভিন্ন বাড়ি এখন ডেভলেপমেন্ট কোম্পানিগুলোর হাতে।’ সামনের দিকে দৃষ্টিধরে ডানহাত সোজা করে পুনরায় বৃদ্ধ বললেন, ‘সোজা রাস্তা ধরে চলে যাবেন। এর পর ডানে মোড়, কাছেই, বেশি দূর নয়।’
একটু থেমে বিরক্ত গলায় বৃদ্ধ বললেন, ‘সম্ভবত ঝামেলার বাড়ির কথা বলছেন। একটা অংশ নিয়ে মামলা চলছে। কেইসের বাড়ি বললে সবাই চিনবে। কেইসের বাড়ি বলবেন?’
বাড়িটি ছিমছাম তো নয়ই, পুরোনো বাড়ি, দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো কিছুই চোখে পড়ল না। কালো গেট, ভেতর থেকে লাগানো। কলিং বেল আছে।
দ্বিতীয়বার চাপ দিতেই এক কিশোরী এল। ফাঁকা দিয়ে বোঝা যায়, বাড়ির কাজের পরিচারিকা, রঙিন ফ্রক পরা। মেয়েটি গেট খুলে ওড়না মাথায় টেনে বলল, ‘কারে চান?’
আমতা আমতা করে সুশান্ত বলল, ‘আচ্ছা, শিশির এখানে আছে না?’
‘শিশির?’
‘হ্যাঁ, শিশিরকুমার?
‘এ্যাইডা আবার কেডা?’ অবাক কণ্ঠ কিশোরীর।
‘শিশির।’
মাথা নেড়ে চিন্তা করে কিশোরী বলল, ‘এ্যাই নামে এ্যাইখানে কেউ থাহে না।’
‘বাড়িতে অন্য কেউ আছে?’
ভুরু তুলে কিশোরী বলল, ‘মানুষ থাকবে না ক্যান, আছে!’
‘ডেকে দাও। তুমি না-ও চিনতে পার? নম্বর তো ঠিকই আছে।’
‘যে নাম কইলেন, এ্যাই নামে কেউ নাই।’ অসন্তোষের ভাব দেখিয়ে কিশোরী বলল, ‘টিক আছে, গেইট লাগাই।’
বাড়ির বারান্দা থেকে নারী কণ্ঠ জিজ্ঞেস করল, ‘কে, কে রে রুকু?’
‘যার নাম উনি কয় তারে তো চিনিও না, জীবনে নামডাও শুনি নাই।’
নারী কণ্ঠের আবার জিজ্ঞাসা, কী নাম?’
দরজাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রুকু বলল, ‘নাম কইল শিশির।’
‘কী নাম কইল?’ নারীটির কণ্ঠ শোনা গেল, কিন্তু দেখা গেল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ‘শিশির শিশির’ উচ্চারণ করতে করতে গেটের সামনে এসে দাঁড়াল নারীটি।
পঁচিশের মতো বয়স। শরীরটা সেরকম নির্মেদ। কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত হলুদ-নীল আঁকা ম্যাক্সির মতো ঢোলা পোশাক। খোলা চুল পিঠের ওপর, চোখ দুটি যেন সুর্মাটানা। এত সুন্দরী, এমন রমণী এ দেশে আছে! বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে সুশান্তর দিকে। মাটি ইত্যাদি দিয়ে যেন নির্মিত মূর্তি!
ঈষৎ বিব্রতভাব হয়ে সুশান্ত জানতে চাইল, ‘শিশিরদের বাড়ি ছিল এটা। আমার মনে হচ্ছে সে দেখলে আমাকে চিনবে?’
‘সে দেখবে কী করে?’
‘মানে, সে এ বাড়িতে থাকে না?’
‘শিশির ইন্ডিয়া থাকে। কবি শিশির। এখন বহুত টাকাওয়ালা।’
সুশান্ত খানিকটা হোঁচট খেল। ‘ও, ঠিক আছে।’ এখন সুশান্তর কী বলা উচিত। ধীরে উচ্চারণ করল, ‘আপনি মনে হয় তার আত্মীয়।’
‘কেন?’
সুশান্ত জানতে চাইল, ‘ঊর্মি নামে শিশিরের একটা বোন ছিল। আপনি কী জানেন?’
তরুণী নারীর কৌতূহল বেড়ে গেল। তাৎক্ষণিক উত্তর না দিয়ে তার চোখ দুটি বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকল।
সুশান্ত আবার বলল, ‘শরৎগুপ্ত রোডের ঊর্মি, শিশিরের বোন ঊর্মি?’
‘ঊর্মি সেইটা তো আমি।’
নারী কণ্ঠ আরও ব্যাকুল হয়ে উঠল, ‘আচ্ছা, জানতে চাই আপনি কে?’
‘আমি কানাডা থাকি। শিশিরের স্কুলজীবনের বন্ধু। নাম সুশান্ত।’
আকাশ থেকে পড়ার মতো ভঙ্গি করে উত্তেজিত কণ্ঠে ঊর্মি জানতে চাইল, ‘সুশান্ত!’ একটু থেমে বলল, ‘আপনাকে তো মোটেই চেনা যাচ্ছে না।’ কিছু একটা চিন্তার পর নারীটি কপাল ভাঁজ করে বলল, ‘আপনি কী সুনামগঞ্জের সুশান্তদা?’
‘হ্যাঁ।’
আবেগাপ্লুত হয়ে বলল, ‘আমি তো ঊর্মি, মনে আছে ঊর্মির কথা?’
‘কেন নয়!’ বলে সুশান্ত মৃদু হাসল।
‘আগে নাদুস-নুদুস ছিলাম, মোটা। এখন স্লিম হতে চেষ্টা করছি। জিমে যাই।’
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তরুণী ঊর্মির চোখ। ‘আসো আসো, তুমি ঘরে আসো। কত অপেক্ষা? কত বছর বাদে, ভাবা যায়?’ বারান্দা অতিক্রম করতে করতে বলে যাচ্ছিল ঊর্মি।