বাংলা সাহিত্যে যে কজন ব্যক্তি সাহিত্যের পথে আলোকোজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল ফজল অন্যতম। তার প্রথম লেখা ‘মশার গান’ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। ছাপার অক্ষরে লেখাটি একটি আরবী গল্প। শেষ বয়সে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসনের সময় সবরকম বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা পরিবেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রচনা করেছিলেন ‘মৃতের আত্মহত্যা’ গল্পগ্রন্থ। পাকিস্তানের আদর্শবিরোধীতায় রেডিও-টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানান। একজন সমাজ-সচেতন মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন নিঃশঙ্কচিত্ত। জাতির সংকটকালীন তার নির্ভীক ভূমিকা প্রসংশনীয়।...
বাংলা সাহিত্যে যে কজন আলোকিত ব্যক্তিত্ব তাদের কর্মের সুকৃতি দিয়ে সাহিত্যের পথে আলোকোজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল অন্যতম।
১৯০৩ সালের ১ জুলাই সাতকানিয়া থানার কেঁওচিয়া গ্রামের এক স্বনামধন্য পরিবারে আবুল ফজলের জন্ম। মৌলভি ফজলুর রহমান ও গুলশান আরার একমাত্র ছেলে তিনি।
১৯২৩ সালে আবুল ফজল নিউস্কিম মাদ্রাসা থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তার সহপাঠী ও বন্ধু ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যানুরাগী আব্দুল হক ফরিদি। সে সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা লিখতেন। আব্দুল হক ফরিদির সম্পাদিত হাতে লেখা পত্রিকায় আবুল ফজলের প্রথম লেখা ‘মশার গান’ প্রকাশিত হয়। ছাপার অক্ষরে তার প্রথম লেখা ‘একটি আরবী গল্প’ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের অক্টোবরে ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। দ্বিতীয় রচনা প্রবন্ধ ‘হযরত মোহাম্মদের বদান্যতা’ প্রকাশিত হয় ঢাকার ‘প্রাচী’ পত্রিকায়।
‘মৃতের আত্মহত্যা’ নামের গল্পটি আবুল ফজল তার শেষ বয়সে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসনের সময় সবরকম বাকস্বাধীনতা রুদ্ধ করা পরিবেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে রচনা করেছিলেন। উল্লেখ্য, আবুল ফজল জিয়াউর রহমানের বারবার অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনটি শর্তে, যার অন্যতমটি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, জিয়াউর রহমানের সম্মতি নিয়ে তার উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন। যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি তার দেওয়া শর্ত বাস্তবায়নের অবস্থা সম্পর্কে সুযোগ পেলেই জিয়াকে প্রশ্ন করতেন। বেশ কিছুদিন পরও যখন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের কোনো অগ্রগতি দেখতে পেলেন না তখন তিনি গল্পের আবরণে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না করার প্রতিবাদ জানিয়ে এ গল্পটি লিখে ‘সমকাল’ ম্যাগাজিনে প্রকাশের জন্য দেন। সমকালের সেই সংখ্যার সব কপি ছাপা সম্পন্ন হলে ভোরেই জিয়ার নির্দেশে পুলিশ ছাপাখানা থেকে বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য ওই ইস্যুটি গোপনে অনেক কপি হয়ে সুধী সমাজের হাতে চলে যায়। বর্তমান ‘মৃতের আত্মহত্যা’ নামের সংকলনটিতে তার রচিত বঙ্গবন্ধু হত্যার ওপর আরও তিনটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে।
কথাসাহিত্যিক আবুল ফজলের লেখা ‘মৃতের আত্মহত্যা’ বইতে লেখা আছে, তার কিছু অংশ তুলে ধরা হলো। ...ডাকে বাবার নামে একখানা চিঠি লিখলো সোহেলী। সংক্ষেপে তাতে অনুরোধ জানালো: বাবা-মা, সোহেলী নামে আপনাদের একটি মেয়ে ছিল সে কথা ভুলে যান। বকুলকে মানুষ করবেন, লেখাপড়ায় ভালো ফল করলে সে যেন অধ্যাপক হয়, অন্তত শিক্ষক, অথবা সাধারণ অন্য যেকোনো চাকরি, হোক তা কেরানির। সে যেন তার বাবার পেশা গ্রহণ না করে। তার জন্যে এ আমার শেষ অছিয়ত। সেই সঙ্গে যুনুসকেও একখানা চিঠি লিখলো: য়ূনুস, মেজর ঘূনুস, তুমি আমার সাহেব, আমার দেহের তুমি মালিক। এ দেহকে তুমি আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে ব্যবহার করেছ, ভদ্রতার খাতিরে ব্যবহার কথাটা প্রয়োগ করলাম, আসলে নির্যাতন কথাটাই ঠিক প্রয়োগ হতো। বাঞ্ছিত পুরুষের সঙ্গে যখন মিলন ঘটে তখন নারীর সর্বদেহ কথা বলে ওঠে, গত দু’বছর ধরে তুমি আমার বোবা দেহের ওপরই চালিয়েছ নির্যাতন। আজ আমার সে দেহটা সম্পূর্ণভাবে তোমাকে দিয়ে গেলাম। এ দেহ আর কোনোদিন কথা বলবে না। যে হাসিকে তোমার বন্ধুরা অতুলনীয় বসে ঈর্ষা করতো, সে হাসি আর কোনোদিন আমার মুখে ফুটবে না। হ্যাঁ, প্রাণের উৎস থেকে উৎসারিত রমণী-মুখের হাসিকে একমাত্র ফুল ফোটার সঙ্গেই দেওয়া যায় তুলনা। একদিন যে হাসি আমি হাসতে পারতাম আর তা ছিল আমার এক পরম সম্পদ, আমার সে হাসিকে তুমি চিরকালের জন্যে নিভিয়ে দিয়েছ। তা আর ফুটবে না, জ্বলবে না কোনোদিন। এখানে এ দূর বিদেশ-বিভূঁয়ে বিষ, বিষের আরবি কি তাও আমি জানি না, সংগ্রহ করা সম্ভব হলো না। তাই অত্যন্ত অশ্লীলভাবে আমার প্রাণটা আমি নিজের হাতে শেষ করে দেহটা তোমার জিম্মায় রেখে গেলাম।...’
চাকরি সূত্রে কলকাতায় তরুণ মুসলমান সাহিত্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তার যোগসূত্র তৈরি হয়। এ সময়ে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শাহাদাৎ হোসেন, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, গোলাম মোস্তফা, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম সামশুদ্দিন প্রমুখ সমকালীন খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিকদের সাহচার্য্যে আসেন। তখন থেকে ‘সওগাত’-এ তার নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়।
১৯৩৩ সালে রাউজানে ‘চট্টগ্রাম জেলা সাহিত্য সম্মেলনে’ কাজী নজরুল ইসলামের উপস্থিতিতে অন্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে আবুল ফজলও যোগ দেন। ১৯৩৩ সালে চন্দনাইশের নায়েববাড়ির মেয়ে সাজেদা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৯৩৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় স্ত্রী সাজেদা খাতুনও মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার কোলে সদ্যজাত শিশু ‘আবুল মহসীন’। এ কঠিন অবস্থায় কবি ওহীদুল আলমের সহযোতিায় এবং বিশেষ করে কন্যার ইচ্ছায় সাহিত্যিক মাহবুব উল আলমের বড় মেয়ে উমরতুলকে ১৯৩৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বিয়ে করেন। পরবর্তীতে যিনি বাংলা সাহিত্যঙ্গনে উমরতুল ফজল নামে সমধিক খ্যাতি লাভ করেন। উমরতুল ফজল আবুল ফজলের সাহিত্যকর্মের আজীবন সহযোগী ছিলেন। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে এমএ পাস করেন আবুল ফজল। এমএ পাস করার পর ১৯৪১ সালের ২ জুলাই কৃষ্ণনগর কলেজের বাংলার অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপন্যাসে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। তাছাড়া সাহিত্যচর্চায় অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেওয়া হয় তাকে।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন অন্যতম যোদ্ধা। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আবুল ফজলের বাসভবন ‘সাহিত্য নিকেতনে’ চট্টগ্রামের সবশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিকর্মী মিলিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গঠন করেন ‘শিল্প সাহিত্যিক সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘ’। আবুল ফজল এর পৃষ্ঠপোষক নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ গড়ার এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্যের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৩ সালের ৪ মে বুধবার রাত ১১টা ১৭ মিনিটে নিজ বাসভবন ‘সাহিত্য নিকেতনে’ বিশাল এক কর্মমুখর জীবনের অবসান ঘটে।
একজন সমাজ-সচেতন মানুষ হিসেবে আবুল ফজল ছিলেন নিঃশঙ্কচিত্ত। জাতির সংকটকালীন তার নির্ভীক ভূমিকা প্রসংশনীয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, বাঙালি সংস্কৃতি এবং বিশেষ করে বাঙালি জাতির প্রতি তার গভীর অনুরাগ ও মমত্ববোধ লক্ষ্যণীয়। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পাকিস্তানের আদর্শবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
আবুল ফজল উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, আত্মকথা, ধর্ম, ভ্রমণকাহিনি ইত্যাদি বিষয়ে প্রচুর লিখেছেন।
তিনি বলেন, ‘ধর্ম যদি মনুষ্যত্বের পরিপূরক বা নামান্তর না হয় তাহলে ধর্ম আর মনুষ্যত্বে পদে পদে সংঘর্ষ অনিবার্য। তিনি ধর্মভিত্তিক শিক্ষার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ফলে তিনি তার লেখায় প্রায়শ এর বিরুদ্ধে জোড় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে শিক্ষাব্যবস্থা তার প্রধান লক্ষ্যই থাকে উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করা। যে নাগরিক পারবে যথাযথ যোগ্যতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সবরকম দায়িত্ব পালন করতে। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই ধার্মিক তৈরির উদ্দেশ্যে শিক্ষা পদ্ধতি প্রণয়ন করে না। করতে চাইলে ফল সম্পূর্ণ বিপরীতই হবে।’ একজন যথার্থ ও আদর্শ শিক্ষকের মতো ছিল তার এসব বক্তব্য।
তিনি জরাজীর্ণ সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে গেছেন। প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক সুস্থ চেতনার সমাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন। তাই তিনি বলেন, ‘ধর্ম যদি মানুষের মনে পারলৌকিক জীবনের নির্দেশকের ভূমিকা ছেড়ে রাষ্ট্রের মতো এক স্থুল জাগতিক তথা সেক্যুলার বিষয়ে জড়িয়ে পড়ে আর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিজের ঘারে তুলে নেয়, তা হলে ধর্ম স্বধর্মচ্যুত না হয়ে পারে না’। তার এসব বক্তব্য ছিল খুবই স্পষ্ট, যা একবিংশ শতাব্দীর জন্যও আলোকবর্তিকা হিসেবে চির দেদীপ্যমান।
আবুল ফজলের দুটি উপদেশ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রায়শ স্মরণ করতেন, তা হলো- ‘বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করো না। কেন না, তাহলে দেশ তার প্রাপ্য হতে বঞ্চিত হবে এবং পরীক্ষার তারিখ পেছানোর জন্য আন্দোলন করো না। তাহলে আমরা জাতিগতভাবে পিছিয়ে যাব।’
নৈতিককতা-বিবর্জিত নষ্ট এক দুঃসহ সময়ে আবুল ফজলের মতো একজন পথ-প্রদর্শকের আজ বড়ই প্রয়োজন ছিল। তিনি ছিলেন কাল-সচেতন শিক্ষক, সমাজমনস্ক শিল্পী, প্রগতি ও আধুনিকতার প্রাণরসে সঞ্জীবিত মানুষ। রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম তার চিন্তায় নানাভাবে এসেছে সাহিত্যে, শিক্ষকতায়, শিক্ষা-ভাবনায়। বুদ্ধিচর্চায়ও তার প্রতিফলন রয়েছে।