একুশে বইমেলা সবসময়ই জমে থাকে। বইমেলার সঙ্গে নাড়ি ও আবেগের সংযোগ আছে। বইমেলাকে আমরা লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের এক মিলনমেলা বলে থাকি। বইমেলায় শিশুদের কর্নারের জায়গাটা অমসৃণ। শিশুরা তো বাঁধনহীন জীবন যাপন করে। শিশুদের জায়গা তো সবচেয়ে সুন্দর হওয়া উচিত।
এবারের বইমেলায় আমার উপন্যাস ‘দূরযাত্রা’ কারুকাজ প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে। আমার বেশির ভাগ উপন্যাসের বিষয়বস্তু ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ এবং আমার বাবাকে নিয়ে লেখা। পরিবার থেকেই শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ গড়ে তোলা যায়, তাহলে মননে, পাঠে আরও সমৃদ্ধ হবে আমাদের মানুষ। অনেক পরিবার আছে, যারা পাঠ্যবইয়ের বাইরে সন্তানদের বই পড়তে দেয় না।
এবারের বইমেলায় আমার ভয় ছিল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই পড়তে পাঠকের আগ্রহ কম থাকবে। কিন্তু মেলায় এসে আমার ধারণাটা ভুল প্রমাণ হলো। মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই পড়তে আরও বেশি আগ্রহী হয়েছে। বাঙালি জাতির একমাত্র বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ওপর আঘাত আসায় মানুষের ভেতরে আবারও দেশপ্রেমের চেতনার জন্ম দিয়েছে। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। আমি নিজে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমার নিজের চোখে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, সেটা নিয়েই লেখি। কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আরও উপন্যাস লিখতে চাই। কারণ আজকের কিশোররাই আগামী দিনের পাঠক। তারা এ দেশের নাগরিক এবং এক সময় দেশ শাসন করবে। শিশুরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জেনে বেড়ে উঠুক।
পাণ্ডুলিপির সুচারু সম্পাদনা হওয়া উচিত। প্রত্যেক প্রকাশনীতে সম্পাদনা বোর্ড থাকা উচিত। তাদের উচিত বইটি মানের দিক দিয়ে কতটা ভালো হয়েছে। কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে, তা নিয়ে লেখকদের লেখা উচিত নয়। লেখকরা আবার স্বাধীন। সেখানে সম্পাদনা বোর্ড থাকলে লেখককে একটু পরামর্শ দিতে পারে। কারণ, মানুষের ভেতর বিভ্রান্তি ছড়ানো ঠিক হবে না। লেখার অনেক বিষয় রয়েছে। বইকে সর্বাঙ্গীনভাবে সুন্দর করা এবং মানদণ্ড বজায় রাখা উচিত। বইগুলো পকেটসাইজ করা দরকার, যাতে পকেটে রেখে পড়তে পারে। পাঠকের মেধা পরিস্ফুটন করতে হলে অনেক ধরনের বই পড়তে হবে। বইমেলা আমাদের জ্ঞানের দুয়ার খুলে দিয়েছে। পাঠকদের উচিত সন্তানদের নিয়ে এসে বই কেনা।
আমাদের বইমেলা মাসব্যাপী হয়, যা বিশ্বের অন্য কোনো দেশে হয় না। ফেব্রুয়ারিতে মেলা হওয়ার ব্যাপারে আমাদের আবেগ জড়িত। আমাদের অগ্রজরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। সেই আবেগটা আমাদের মনের ভেতরে এমনভাবে গ্রথিত হয়েছে, যার কারণে অনেক লেখক তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের সেই আবেগ ধরে রাখার জন্যই আমাদের বইমেলা। এজন্য বেশির ভাগ লেখকই চান বইমেলায় তার বই প্রকাশ হোক, যাতে মানুষ বেশি বই কিনতে পারে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
অনুলিখন: সানজিদ সকাল