এবারের বইমেলা বৈচিত্র্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। বইমেলায় এবার আমার দুটি বই বের হচ্ছে। প্রতিবছরই মেলায় অনেক লেখকের বই প্রকাশ হয়। কিন্তু বই কতটা বই হয়ে উঠছে, সেটাই দেখার বিষয়। প্রথম সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের যেমন আদর থাকে; প্রত্যেক লেখকের প্রথম বইয়ের প্রতি তেমন ভালোবাসা থাকা উচিত।
লেখক মূল্যায়ন হয় পাঠকের মাধ্যমে। লেখক বই বের করার পর পাঠক বইটাকে কতটা আপন করে নিচ্ছে, তা দেখতে হবে। মানুষের দুঃখ-বেদনা, প্রাপ্তির ঘটনা যদি বইতে থাকে, পাঠক তা আপন করে নেয়। বইয়ের বিষয়বস্তু যদি মানবজীবনসংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে গ্রহণ করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বর্তমান কালের বইগুলো বেশির ভাগই জীবনসংশ্লিষ্ট হয়ে ওঠে না। যার ফলে বইগুলো কালের আবর্তে হারিয়ে যায়।
একটা বই লিখতে হলে লেখকের অনেক চিন্তাভাবনা করেই লেখা উচিত। কারণ বই লিখতে গেলে একটা গাছের মৃত্যু হয়। কারণ বৃক্ষের জীবনাবসান করেই কাগজ তৈরি হয়। একটা জীবন্ত বৃক্ষ বহুকাল একটি বইকে ধারণ করবে, তাই ভেবেচিন্তে বই লেখা দরকার। লিখতে হলে পড়াশোনা করে বাস্তবতার পরিপেক্ষিতে বই লেখা উচিত। তাহলেই বই বই হয়ে উঠবে।
আমি হিন্দু সমাজব্যবস্থার তলানিতে জন্মগ্রহণ করেছি। হিন্দু সম্প্রদায়ের একদম নিচু জায়গায় যাদের অনেকে মানুষ বলে মনে করে না, সেখানে আমার জন্ম। এই সমাজে জন্মগ্রহণ করার ফলে নানা রকম লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। সেই অবিচার, লাঞ্ছনা এবং বারবার পদদলিত হওয়ার পর আমার লেখালেখি শুরু। আমি যেহেতু তথাকথিত ছোট জাতে জন্মগ্রহণ করেছি, এদের জীবন, ইতিহাস, কষ্ট, বেদনা নিয়েই আমি লেখালেখি করি। কারণ খুব কম লেখকই এদের জীবন নিয়ে লিখে থাকেন। আমি সমাজের যে জাতে জন্মগ্রহণ করেছি, তাদের প্রতি আমার ঋণ আছে। তাদের দুঃখ-বেদনা মানুষকে জানানোর প্রতি আমার দায় আছে। অনেকেই আমাকে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘আর কতদিন লিখবেন ছোটলোকদের নিয়ে।’ আমি তাদের বলেছি, যদি আপনারা তথাকথিত ছোটলোকদের নিয়ে লেখা শুরু করেন, তাহলে আমি আর লিখব না। আমি চেয়েছি নিম্ন শ্রেণির মানুষের জন্য একটা আন্দোলন হোক। কেউ তো এদের নিয়ে লেখে না। সবাই ড্রয়িংরুমের প্রেমকথা লিখে থাকে।
বাংলাদেশে হিন্দু মিথলজি নিয়ে খুবই কম লেখালেখি হয়েছে। হিন্দু মিথলজির মধ্যেও মানবধর্ম আছে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির মধ্যে যে মানবধর্ম আছে, তা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি।
আরেকটি কথা বলতে চাই, সাহিত্য পুরস্কার একসময় খুব পবিত্র জিনিস ছিল। পৃথিবীর মধ্যে অনেক জিনিস থাকে, যা কলুষিত থাকে। পৃথিবীর মধ্যে এমন কিছু জিনিস থাকে, যা পবিত্র থাকা উচিত। সেসব জায়গায় নির্মল থাকা উচিত। সাহিত্য পুরস্কারের জায়গাটাও একদম পবিত্র থাকা উচিত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
অনুলিখন: সানজিদ সকাল