বইমেলা আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি। বাঙালিরা আড্ডাপ্রিয় এবং সবাই আড্ডা দিতে ভালোবাসে। আগে গ্রামগঞ্জে বহু মেলা হতো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বই নিয়ে মেলা হতে দেখা যেত। তখন আমাদের মাথায়ও মেলার চিন্তা এল। ভাষাভিত্তিক চেতনা থেকেই মূলত বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন যখন হয়, তখন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষাভিত্তিক একাডেমি হওয়ার কথা বলেছিলেন। এভাবেই বাংলা একাডেমির যাত্রা।
১৯৭২ সালে যখন বাংলা একাডেমিতে প্রথম সাহিত্য সম্মেলন হয়, তখন মুক্তধারার প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা মাটিতে চট বিছিয়ে বই বিক্রির চিন্তা করলেন। প্রথম দিকে মানুষ তাকে দেখে হাসাহাসি করত। তার পর থেকে প্রতিবছর আরও কিছু প্রকাশক যুক্ত হলেন এবং পাঠক বই কিনতে শুরু করলেন। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমি দেখল যে, এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দরকার। তখন থেকেই অমর একুশে গ্রন্থমেলা নামে বইমেলা শুরু হলো। এবার বইমেলায় ছোটদের জন্য ‘পাতায় মোড়া পদ্মগুলি’ নামে পান্থজন প্রকাশনী থেকে আমার একটি বই বের হচ্ছে।
সাহিত্য হলো অভিব্যক্তির প্রকাশ। বাংলাদেশের মানুষ ভৌগোলিক কারণেই অনেক বেশি আবেগপ্রবণ। এর মূল কারণ সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুর কারণেই মানুষের মন পরিবর্তন হয়। শিক্ষিত বাঙালিরা জীবনে একবার হলেও কবিতা লেখার চেষ্টা করেন। এ কারণেই দেশে কবির সংখ্যা বেশি এবং পাঠক কম। পাঠক কম হওয়ার আরও একটি কারণ আছে, তা হলো- মানুষ গল্প শুনতে ভালোবাসে। ছোট্ট শিশুরাও মায়ের কোলে গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ শিশুদের মধ্যে তাল ও রিদম আছে, সেই তালে তালে ঘুমিয়ে পড়ে। দোলনায় দুলতে দুলতেই বাচ্চারা ঘুমিয়ে যায়। কবিতা ও ছড়ার মধ্যেও তেমন তাল আছে। সারা পৃথিবীতেই কবিতার পাঠক কম। কবিতার পাঠক সুনির্দিষ্ট। যেসব কবিতা চিরস্থায়ী হয় তা অবশ্যই ছন্দনির্ভর। ছন্দের বাইরে গেলে চিরস্থায়ী হবে না। কবিতার মূল বিষয় তার অন্তর্গত চেতনা। কবিতায় ছন্দ থাকে পাঠককে সাহায্য করার জন্য। কবিতা পড়ে পাঠক মজা পেলে পড়বে। যদি কোথাও খটকা লেগে যায়, তাহলে পাঠক পড়বে না। কোনো কোনো কবিতা বিষয়বস্তুর কারণে পাঠকপ্রিয়তা পায়। চিরস্থায়ী হতে গেলে অবশ্যই ছন্দ ও ধ্বনিগত দ্যোতনা দরকার। কবিতা হলো দর্শনভিত্তিক। সব লেখা কবিতা নয়। এ জন্যই জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ কবি, সকলেই কবি নয়’।
বাঙালিরা আড্ডাপ্রিয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষ আড্ডাপ্রিয় নয় বলেই সেখানে বাঙালিরা থাকতে মজা পান না। আমাদের সংস্কৃতি একটু ভিন্ন। আমাদের এই ভিন্ন সংস্কৃতির থেকেই বইমেলার সংযোগ আছে। বইমেলা হলো লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মিলনমেলা। এখন বইমেলায় মানুষ শুধু বই কিনতে আসেন না, ঘুরতে ও আড্ডা দিতে আসেন। এ কারণেই বইমেলায় যত দর্শক আসেন তত বই ক্রেতা পাই না। ছোটদের বই পড়তে উৎসাহিত করা উচিত, কারণ জ্ঞানের আধার হলো বই।
অনলাইনে যতই বই প্রকাশিত হোক বা পাঠক যতই ই-বুক পড়ুক। মুদ্রিত বইয়ের চাহিদা চিরদিন থাকবে। যতদিন সভ্যতা আছে ততদিন বইয়ের চাহিদা থাকবে।
লেখক: কবি
অনুলিখন: সানজিদ সকাল