অমর একুশে বইমেলার অষ্টম দিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। মেলাজুড়ে রোজার প্রভাব একেবারে স্পষ্ট। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের আড্ডায় মেলা প্রাঙ্গণ যেখানে মুখরিত থাকার কথা, সেখানে পাঠক-দর্শনার্থী খরায় ভুগছে এবারের মেলা। মেলা ঘিরে সেই চিরায়ত ধারণা একেবারে ফিকে হয়ে গেছে। বাংলা একাডেমির আয়োজনে লেখকদের নিয়ে আড্ডা ‘লেখক বলছি’ এবং নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে শুরু থেকেই হাতে গোনা উপস্থিতি। এমন ছন্দপতনের মেলার মধ্যেও মেলার ছন্দ কিছুটা ধরে রেখেছে পুতুলনাট্য। বয়সে ছোট থেকে বড়–সবার দৃষ্টি কেড়েছে কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের এই পুতুলনাট্য।
সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রতিদিনই কয়েক পর্বে তারা পাপেট শো, পুতুল নাচ, গল্প পাঠের আসর সাজিয়ে রেখেছে। এ ছাড়া সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে রেখেছে বায়োস্কোপ আর পুতুল তৈরির কর্মশালা। শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা ও ৩টা এবং সন্ধ্যায় মঞ্চায়িত হচ্ছে কাকতাড়ুয়ার পাপেট শো। অন্যদিনগুলোতে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কাকতাড়ুয়ার এই আয়োজন। প্রতিটি শো ১৫ থেকে ২০ মিনিটের।
কথা হয় কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের অন্যতম উদ্যোক্তা আশাদুজ্জামান আশিকের সঙ্গে। আশিক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘গত বছর আমরা মেলায় এসেছিলাম, তবে সেবার স্টল পাইনি। এবার পেয়েছি, যদিও পুরো আয়োজনে বাংলা একাডেমির সহযোগিতা রয়েছে।’
এই শোর মধ্য দিয়ে সমাজের কুসংস্কারগুলোকে দূর ঠেলে দিতে চান উল্লেখ করে আশিক বলেন, ‘পাপেট তো সমাজের জন্য, কেননা পুতুলনাট্যই অসম্ভবকে সম্ভব করার একটি শিল্প। ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ-পাখি যেন ফসল নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য জমিতে কাকতাড়ুয়া রাখা হয়। তেমনি আমাদের যে কাকতাড়ুয়া, তা সমাজের কুসংস্কারগুলো দূর করে নতুন কিছু মেসেজ দিতে চায়।’
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের এই দলে ১২ জনের মতো সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থী, পাশাপাশি ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী রয়েছেন। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলার শিক্ষার্থী। কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের সদস্য ও জাবির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তৌহিদ মোস্তাক নীল বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের গড়ে সাত-আটটির মতো শো হচ্ছে। তবে শুক্র-শনি আমাদের নির্ধারিত শো থাকে না। আমাদের শোতে সপ্তাহে একটি করে নতুন গল্প আনা হয়, তার ওপর ভিত্তি করে সপ্তাহের বাকি দিন একই শো চলতে থাকে। সব মিলিয়ে ছোট-বড় সব দর্শনার্থীর কাছ থেকে ভীষণ ভালো সাড়া পাচ্ছি।’
পুতুলনাট্য, বিশেষ করে শিশুদের মনের খোরাক জোগাবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী ফাতিমাতুজ জোহরা বিনি বলেন, ‘এমন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা চাই বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি দূর হোক। আমরা তাদের মধ্যে একধরনের জিজ্ঞাসা তৈরি করতে চাই। যেন তাদের মধ্যে এই বোধ জাগে নিজেদের কিছু করতে হবে, আমরা তাদের মধ্যে সেই প্রয়াসটি তৈরি করতে চাই।’
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের আরেক সদস্য মো. রবিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাপেট শো বড়-ছোটদের বিষয় না। যেই গল্প আমরা নির্ধারণ করেছি, সেটি সবার জন্য উপযুক্ত। তা ছাড়া পুতুল নাচ তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। সময়ের পরিক্রমায় এটা অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা এই ঐতিহ্যকে সবার সামনে আনতে চাই, যেন কালের অতল গহ্বরে আমাদের এই ঐতিহ্য বিলীন না হয়ে যায়।’
এখন পর্যন্ত মেলায় এসেছে ২৮২টি নতুন বই। গতকাল বৃহস্পতিবার বইমেলার অষ্টম দিনে নতুন বই এসেছে ৯২টি। এর মধ্যে গল্পের বই ছিল ৭টি, উপন্যাস ১২টি, প্রবন্ধ ১টি, কবিতা ২৭টি, গবেষণা ৩টি, জীবনী ১০টি, বিজ্ঞান ৩টি, ইতিহাস ১টি, রাজনীতি ৫টি, স্বাস্থ্য ৩টি ও অন্যান্য ৮টি। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত মেলায় নতুন প্রকাশ হওয়া নতুন বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮২টিতে।
আজকের মেলার সময়সূচি ও আলোচনা অনুষ্ঠান: আজ শুক্রবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। মেলায় থাকবে শিশুপ্রহর। বেলা ৩টায় বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেবেন সাইম রানা। সভাপতিত্ব করবেন সাধন ঘোষ। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।