জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আমির হোসেন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ জমা দেওয়ার এক বছর পার হলেও এখনো তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভাগের সাবেক ও বর্তমান সভাপতি, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের কিছু সদস্য এবং প্রশাসনের কয়েকজন প্রভাবশালী শিক্ষক ও কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করছেন।
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিভাগের ৪৭তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে বিভাগীয় সভাপতির কাছে যৌন হয়রানি ও কর্তৃত্ববাদী আচরণের অভিযোগ জমা দেন। তারা জানান, অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়া শিক্ষার্থীদের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।
প্রাথমিকভাবে গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি কিছু অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। এরপর উপাচার্যকে প্রধান করে স্ট্রাকচারাল কমিটি গঠন করা হয়। তবে এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও কমিটি তাদের তদন্ত শেষ করতে পারেনি। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের একজন মাহফুজুল ইসলাম মেঘ।
তিনি বলেন, ‘অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়া অনেকদিন ধরে শিক্ষার্থীদের প্রতি অশ্লীল আচরণ ও বৈষম্য করে আসছেন। এর আগে যৌন হয়রানি ও গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগে তিনি সাময়িক অব্যাহতি ও বহিষ্কারের শাস্তি পেয়েছেন। তবু আচরণে পরিবর্তন আসেনি। অভিযোগের দেড় বছর পরও তদন্ত বিলম্বিত, প্রভাবশালীদের রক্ষায় শিক্ষার্থীরা আজ প্রতারিত ও হতাশ।’
তদন্ত কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের বিষয়টি অস্বীকার করে বিভাগের সাবেক সভাপতি ও জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জামালউদ্দিন রুনু বলেন, ‘আমি সভাপতি থাকাকালীন বারবার উপাচার্যকে দ্রুত সমাধানের জন্য অনুরোধ করেছি। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী কমিটিতে আমার থাকা প্রয়োজন হলেও আমাকে রাখা হয়নি। এ ছাড়া অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত করা উচিত, কিন্তু তা হয়নি। উনি স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ সময়ে এটির নিষ্পত্তি না হওয়া আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতা। আমি বা আমার ফোরাম কখনো তদন্তে বাধা দিইনি। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে এই অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।’
তদন্ত ও বিচারে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক রাশেদুল আলম বলেন, ‘আমি স্ট্রাকচারাল কমিটির কার্যক্রমের বিষয়ে অবগত নই এবং আমার কোনো প্রভাবও নেই। এখানে একটি ব্যাচ অভিযোগ দিয়েছে, বাকি ব্যাচগুলো তো দেয়নি, তারা তো ক্লাস করছে। অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে শাস্তি হোক, নির্দোষ হলে মুক্তি পাক।’
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্ত অধ্যাপক আমির হোসেন ভূঁইয়া জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের হওয়ায় তাকে তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। তবে ফোরামের নেতারা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, ‘আমরা কখনো তদন্তে হস্তক্ষেপ করি না। যদি অভিযুক্ত দোষী হন, যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিত।’
শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন বলেন, ‘যৌন হেনস্তার বিষয় দীর্ঘ বিলম্বিত হলে এর প্রভাব পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়বে। প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তকে অবশ্যই সাময়িক বরখাস্ত করতে হবে।’
স্ট্রাকচারাল কমিটির সদস্যসচিব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত ও বিচারকার্যের বিলম্বের কারণ হলো অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একাধিক কমিটি কাজ করছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসহ অন্য ইস্যুতে একাধিক কমিটি যুক্ত থাকায় বিলম্ব হয়েছে। আরও ন্যূনতম তিনটি মিটিংয়ের পর সুপারিশ সিন্ডিকেটে পাঠানো হবে। সিন্ডিকেট থেকে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
এদিকে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, অভিযোগ জমা দেওয়ার এক বছর পার হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়নি, যা তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তারা দ্রুত নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, তদন্তের দ্রুত সমাধান এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিষয়ে প্রশাসনের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দাবি করেছেন।