পৃথিবীর কোনো কোনো প্রান্তে নারীকে যখন ঘরে বন্দি রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এমনই এক সময়ে প্রস্তুতি ছাড়াই এক নারী রীতিমতো মহাকাশে কাটিয়ে এসেছেন দীর্ঘ নয় মাস। বলা হচ্ছে মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামসের কথা; যিনি মহাকাশে গড়েছেন একের পর এক রেকর্ড। নির্ভীক এই নারী এর আগেও অংশ নিয়েছেন বহু মহাকাশ অভিযানে। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা-নাসার অন্যতম অভিজ্ঞ মহাকাশচারী সুনীতা উইলিয়ামসের মহাকাশ জয়ের কাহিনি নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন ফারজানা ফাহমি
সুনীতা উইলিয়ামস ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ইউক্লিড শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সুনীতা লিন উইলিয়ামস। তার বাবা দীপক পান্ড্য একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক, আর মা বনি পান্ড্য ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত।তিনি ম্যাসাচুসেটসের নিডহ্যামে বেড়ে ওঠেন এবং নিডহ্যাম হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে ইউনাইটেড স্টেটস নেভাল অ্যাকাডেমি থেকে শারীরিক বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্নাতক শেষ করার পর তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং একজন হেলিকপ্টার পাইলট হিসেবে কাজ করেন। তিনি বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়ে ৩ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় ৩০ ধরনের হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে অভিযান প্রকৌশল (ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট) বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
নিজের ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে একটা সময় সুনীতা হয়ে ওঠেন নভোচারী। ১৯৯৮ সালে তিনি নাসায় নভোচারী হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রশিক্ষণের পর ২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো মহাকাশে যান এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস কাটান সুনীতা। সেবার তার মহাকাশে কাটানো ১৯৫ দিন ছিল কোনো নারী মহাকাশচারীর মহাকাশে কাটানো সর্বোচ্চ সময়। ওই মিশনে তিনি চারবার স্পেসওয়াক করেন। সেবার সবমিলিয়ে মোট ২৯ ঘণ্টা ১৭ মিনিট স্পেসওয়াক করেছিলেন সুনীতা।
এরপর ২০১২ সালে তিনি আবারও মহাকাশে যান এবং গড়েন নতুন রেকর্ড। ১৫ জুলাই ২০১২ সালে তিনি সয়ুজ-টিএমএ ০৫এম মিশনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বার মহাকাশে যাত্রা করেছিলেন। দ্বিতীয় দফায় ১২৭ দিন মহাকাশে কাটান অদম্য এই নভোচারী। এই মিশনে তিনি স্পেসওয়াকের মাধ্যমে ৫০ ঘণ্টার বেশি সময় মহাকাশের বাইরে কাজ করেন। এটিও ছিল কোনো নারী মহাকাশচারীর জন্য রেকর্ড।
.jpg)
সবশেষ গত বছরের ৮ জুন আরেক সহকর্মী বুচ উইলমোরকে সঙ্গে নিয়ে আবারও মহাকাশ যাত্রা করেন সুনীতা। কথা ছিল আট দিনের মহাকাশ অভিযান শেষে ফিরে আসবেন তারা কিন্তু কারিগরি জটিলতায় স্পেস স্টেশনেই আটকা পড়েন তারা। তার পর সেখানে বাধ্য হয়েই কাটান নয় মাস!
দীর্ঘ নয় মাস প্রায় প্রস্তুতিবিহীন মহাকাশ অভিযানে বসে থাকেননি বুচ ও সুনীতা। তারা গবেষণা করে বের করেছেন মাইক্রো গ্র্যাভিটিতে কোন কোন ফসল উৎপাদন করা যায়, মহাকাশে ফুল ফোটানো সম্ভব কি না- ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, একজন মহাকাশচারীকে যেহেতু নানা শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার হৃৎপিণ্ড, কিডনি ইত্যাদি কতটা সক্রিয় থাকে, কীভাবে থাকে- প্রায় প্রস্তুতিবিহীন অভিযানে সেসবও সেরে নিয়েছেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এই দুই নভোচারী।
কয়েক মুহূর্ত লিফটে আটকে গেলে অনেকের যেখানে দম বন্ধ হয়ে যায়, সেখানে সুনীতা মহাকাশের মতো রহস্যঘেরা জায়গায় নিজের প্রিয় ফুলও ফুটিয়ে ফেলেছেন।
সুনীতা উইলিয়ামস ভেঙে দিয়েছেন নারীর অপারগতার মিথ। সাহস এবং হার না মানা এ নারী প্রমাণ করে দিয়েছেন নারীরা চাইলে সবকিছুই করতে পারে, সেটা হতে পারে পাহাড় জয় কিংবা মহাকাশ।
/ফারজানা ফাহমি
.jpg)