বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে। ঘরের ভেতর, স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছেন অসংখ্য নারী। আইন ও সালিশ কেন্দ্র, জাতীয় হেল্পলাইন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই পারিবারিক সহিংসতা প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোথায় গিয়ে এর শেষ?
পরিসংখ্যানে ভয়াবহতা
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩৬৩টি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ৩২২ জন নারী নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ১৩৩ জন স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, এত বড় অপরাধের পরও মামলা হয়েছে মাত্র ৬৪টি ঘটনায়। স্বামীর পরিবারের নির্যাতনে নিহত হয়েছেন ৪২ জন নারী। এখানেও অর্ধেকের বেশি ঘটনায় মামলা হয়নি।
এ সময় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ২৪ জন নারী, কিন্তু মাত্র ১০ জন মামলা করেছেন। একই সময়ে আত্মহত্যা করেছেন ১১৪ জন নারী। নির্যাতনের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে তারা স্বেচ্ছায় মৃত্যুর পথ বেছে নেন। অথচ এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১৫০টি। মামলা হয়নি ২১৪টি ঘটনায়।
তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা ছিল ২৬৯টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুর হার দুটোই বেড়েছে। বাড়ির ভেতরের সহিংসতা যে কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে, এই পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ।
হেল্পলাইন ও মাঠপর্যায়ের চিত্র
জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯-এ চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাইয়ে শারীরিক নির্যাতন সংক্রান্ত কল এসেছে ২৯ হাজার ১৬১টি এবং মানসিক নির্যাতন সংক্রান্ত কল এসেছে ১৯ হাজার ৫৮৪টি। পুলিশের ৯৯৯ নম্বরে শুধু স্বামীর সহিংসতার অভিযোগেই কল এসেছে ৯ হাজারের বেশি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৫৫ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২২ জন। শুধু জুলাই মাসেই ২৩৫ জন নারী সহিংসতার অভিযোগ করেছেন।
এরকম নির্যাতনের শিকার একজন হচ্ছেন সাথী (ছদ্মনাম)। স্বামীর হাতে বছরের পর বছর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এই নারী বলেন, ‘বিয়ের পর জামাই মারলে সবাই বলত নতুন বিয়ে, গরম রক্ত। কিন্তু আজও একই অবস্থা। পড়ালেখাও করি নাই, কোথায় যাব?’

অন্যদিকে স্নাতকোত্তর করা নুরজাহান (ছদ্মনাম) স্বামীর চড়-থাপ্পড় সহ্য করেন শ্বশুরবাড়ির সবার সামনে। তিনি বলেন, ‘যাদের সামনে এমন ঘটনা ঘটল, তারাও চুপ করে ছিল। নিজের পরিবারও বলল ঘরের কথা ঘরে থাকাই ভালো।’
কেন বাড়ছে সহিংসতা?
বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা দিনদিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর পেছনে কয়েকটি মূল কারণ স্পষ্টভাবে দায়ী। প্রথমত, সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নারীদের অধিকার ও মর্যাদাকে খাটো করে। দ্বিতীয়ত, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধীরা জানে তারা সহজে শাস্তি পাবে না। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদাসীনতা ও জটিল বিচারপ্রক্রিয়া ভুক্তভোগীদের মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে। চতুর্থত, অনেক সময় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীরা রক্ষা পায়, যা নারীর প্রতি সহিংসতা থামাতে সবচেয়ে বড় বাধা।
এ ছাড়া সামাজিক চাপ ও পরিবারকে ‘লজ্জা’ থেকে বাঁচানোর প্রবণতা নারীদের নীরব থাকতে বাধ্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতদিন না ন্যায়বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিশ্চিত হবে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যাবে, ততদিন সহিংসতার হার কমানো সম্ভব নয়। এ কারণেই পারিবারিক সহিংসতা আজ উদ্বেগজনক স্তরে পৌঁছেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘অপরাধীরা জানে, শাস্তি পাবে না। তাই তারা আরও বেপরোয়া হচ্ছে।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘পরিসংখ্যানে যা দেখা যাচ্ছে তা সামান্য। বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সমাজে আইনশৃঙ্খলার অবনতির সুযোগেই সহিংসতা বাড়ছে।’
বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) রয়েছে। এই আইনগুলোতে ক্ষতিপূরণ, ভরণপোষণ, আশ্রয় এবং এমনকি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধানও আছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল।
ব্র্যাকের ২০২৪ সালের এক গবেষণা বলছে, প্রসিকিউশন ধাপে ধাপে ভেঙে পড়ে। গড় তদন্ত শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৯৩ দিন। সাক্ষী সুরক্ষা নেই, আদালতে হাজিরা ও খরচের চাপ ভুক্তভোগীকে নিরুৎসাহিত করে। অনেকেই মামলা না করে চুপ থাকেন। আর এ শূন্যতাকেই ব্যবহার করে অপরাধীরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
সংখ্যা, ঘটনা আর ভুক্তভোগীর বর্ণনা আমাদের সামনে এক ভয়াবহ বাস্তবতা হাজির করছে। যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নারী ঘরের ভেতরেও নিরাপদ নয়। অথচ পরিবারই হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তাই এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অপরাধীরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে না পারে। দ্বিতীয়ত, সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন। পাশাপাশি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যেন সহিংসতাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে না দেখা হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কারণ আইন প্রয়োগে দুর্বলতা সমস্যাকে আরও গভীর করে। সর্বোপরি, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তারা আত্মনির্ভর হয়ে সহিংসতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারবেন। তাই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে যেন পারিবারিক সহিংসতা কমিয়ে একটি নিরাপদ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
সর্বোপরি, পারিবারিক সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তাই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এমন চিত্র সত্যিই ভাবনার। যার ফলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, ‘পারিবারিক সহিংসতার শেষ কোথায়?’
তথ্যসূত্র: ডয়চে ভেলে, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
/এস লুপিন
.jpg)