নিজেকে ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট সময় কিংবা মানদণ্ড নেই। আপনার জীবনের প্রতিটি পরিবর্তনই একেকটি বাস্তবতাকে বহন করে। তেমনি গর্ভকালীন শরীর-সৌন্দর্যের পরিবর্তন নারীর কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। তাই এই বিশেষ সময়ে নিজেকে ভালোবাসার বিকল্প নেই।
গর্ভধারণ একজন নারীর জীবনে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এটি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনি অন্যদিকে ভরপুর চ্যালেঞ্জের। নতুন প্রাণকে বুকে ধারণ করার প্রস্তুতিতে শরীর ও মনের ভেতর অগণিত পরিবর্তন ঘটে যায়। অনেকে এ সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিনতে পারেন না। হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া, ত্বকের টান, মুখে ক্লান্তি কিংবা আবেগের ওঠানামা সব মিলিয়ে মনে হয় আর আগের মতো লাগছে না। তখন নিজের প্রতি এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। ফলে এই সময়েই সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিজেকে ভালোবাসা, নিজের এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা।
চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী, গর্ভকালীন শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রথম তিন মাসে বমি, অস্বস্তি, খাবারের প্রতি অনীহা বা হঠাৎ ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে শরীর ভারী হয়ে ওঠে, ত্বকে স্ট্রেচ মার্ক দেখা দেয়, কখনো কখনো চুল ঝরে যায়, দাঁতে সমস্যা দেখা দেয়। পায়ের ফোলা বা কোমরে ব্যথাও অনেক নারীর জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।
এ সময় অনেক নারী মনে করেন, তারা আগের মতো আকর্ষণীয় নন। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে হতাশা কাজ করে। অথচ এসব পরিবর্তনই হলো এক আশ্চর্য যাত্রার প্রমাণ। একটি নতুন প্রাণকে ধারণ করতে গিয়ে শরীর তার ভেতরের জগৎকে বদলে নিচ্ছে। প্রতিটি দাগ, প্রতিটি রেখাই আসলে মাতৃত্বের চিহ্ন।
গর্ভাবস্থার আরেকটি বড় দিক হলো মানসিক পরিবর্তন। হরমোনের তারতম্যের কারণে মেজাজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে। এক মুহূর্তে আনন্দে চোখ ভিজে যায়, আরেক মুহূর্তে অকারণ ভয় বা কান্না এসে ভর করে। অনেকেই অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা বা একাকিত্বে ভোগেন। বিশেষ করে নিজের শরীরের পরিবর্তন মেনে নিতে না পেরে অনেক নারী আত্মবিশ্বাস হারান। মনে হয়, আর সুন্দর লাগছে না, স্বামী বা পরিবার আগের মতো ভালোবাসবে তো? এসব ভাবনা মনের ওপর ভারী চাপ তৈরি করে।
এমন সময়ে নিজেকে ভালোবাসা মানেই নিজের শরীর ও মনকে নতুনভাবে গ্রহণ করা। প্রতিটি দাগকে, প্রতিটি ক্লান্তিকে সম্মানের চোখে দেখা। মা হওয়া মানে নিখুঁত শরীর হারানো নয়, বরং শরীরের ভেতরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন এক জীবনের সৌন্দর্য। প্রকৃত অর্থে আত্মপ্রেমের বিকল্প নেই। তাই জীবনের সব পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখতে হবে।
নিজেকে ভালো না বাসলে, অযথা অপরাধবোধ বা হীনম্মন্যতায় ভুগলে, মায়ের মন আরও অস্থির হয়ে ওঠে। এতে গর্ভকালীন মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার পাশাপাশি সন্তানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই প্রথমেই প্রয়োজন আত্মপ্রেম।
তাই নিজেকে ভালোবাসা মানে প্রতিটি পরিবর্তনকে গ্রহণ করে নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনে নেওয়া। গর্ভাবস্থায় এটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। তাই প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় নিজের জন্য আলাদা করুন। প্রিয় গান শুনুন, বই পড়ুন বা কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিন। এতে মন শান্ত হবে। শরীরের যত্ন নিন পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং হালকা ব্যায়াম শরীরকে সক্রিয় রাখবে ও মানসিক শক্তি বাড়াবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবিকে ভালোবাসতে শিখুন। মনে মনে বলুন, ‘পরিবর্তিত আমি সুন্দর।’ এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
যেকোনো দুশ্চিন্তা বা ভয় লুকিয়ে না রেখে নিজের সঙ্গী, পরিবার বা কাছের কারও সঙ্গে ভাগ করে নিন। খোলামেলা কথা বললে মানসিক চাপ অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেকে ক্ষমা করা। ক্লান্তি বা অস্বস্তির কারণে কিছু করতে না পারলে অপরাধবোধে ভুগবেন না। মনে রাখবেন, আপনি ইতোমধ্যেই সবচেয়ে মহৎ কাজ করছেন একটি ‘জীবন’ বহন করছেন। তাই প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে ভালোবাসুন, নিজের যত্ন নিন, কারণ সুখী মা-ই পারে সন্তানের জন্য সুখী পৃথিবী তৈরি করতে। নারীর এই বিশেষ সময়ে নিজেকে ইতিবাচক রূপে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সমাজ ও পরিবারেরও অনেক দায়বদ্ধতা থেকে যায়। গর্ভকালীন পরিবর্তনকে নারীর শক্তির নিদর্শন হিসেবে দেখা উচিত। পরিবারের সবার উচিত মাকে সাহস দেওয়া, প্রশংসা করা, বোঝাপড়ার মনোভাব দেখানো। অনেক সময় একটি কোমল বাক্য বা আন্তরিক সমর্থন গর্ভবতী নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে বিশাল পরিবর্তন আনে।
সুতরাং গর্ভাবস্থার প্রতিটি পরিবর্তনই আসলে একেকটি সৌন্দর্যের গল্প। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে আয়নায় নিজেকে অপরিচিত মনে হবে, মনের ভেতর ঝড় বইবে। কিন্তু মনে রাখবেন এই পরিবর্তনই আপনাকে মা হওয়ার অনন্য মর্যাদা দিচ্ছে।
তাই নিজেকে অবহেলা নয়, ভালোবাসুন। নিজের শরীরকে সম্মান করুন, মনের ওঠানামাকে মেনে নিন। পরিবর্তনকে ভয় নয়, বরং ভালোবাসুন। কারণ, পরিবর্তনই মাতৃত্বের আসল সৌন্দর্য।
তথ্য সূত্র: অফিস অন উইমেন্স হেলথ
/এসএল