বাংলাদেশের মানবাধিকার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করছে ‘গুম অনুসন্ধান কমিশন’। এটি একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বলপূর্বক গুম ও নিখোঁজদের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। এই কমিশন রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও মানবাধিকারের আলোচনাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। এই ঐতিহাসিক প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছেন এক অসাধারণ নারী ড. নাবিলা ইদ্রিস, যিনি এখন ‘গুম কমিশনের মস্তিষ্ক’ হিসেবে পরিচিত।
জ্ঞান, গবেষণা ও নেতৃত্বের এক অনন্য সংমিশ্রণ
ড. নাবিলা ইদ্রিস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নীতিবিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে তিনি বৈশ্বিক সামাজিক সুরক্ষাবিষয়ক গবেষণায় যুক্ত। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) খণ্ডকালীন গবেষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট আইভিএলপি প্রোগ্রামের ফেলো হিসেবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। চীন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে নীতি বিশ্লেষণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহি-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ড. নাবিলার গবেষণার মূল দৃষ্টি ক্ষমতার কাঠামো, নীতি-নির্ধারণের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার ওপর। এই তাত্ত্বিক গভীরতা ও বিশ্লেষণী নেতৃত্বই তাকে আজকের গুম অনুসন্ধান কমিশনের ভাবনাশক্তি ও দিকনির্দেশক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কমিশনের অভ্যন্তরে তার ভূমিকা
কমিশনের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। তবে কমিশনের কাঠামো, গবেষণা পরিকল্পনা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও নীতিগত সুপারিশ তৈরির প্রধান দায়িত্বে রয়েছেন ড. নাবিলা ইদ্রিস। তার তত্ত্বাবধানে কমিশন ইতোমধ্যেই দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন এবং একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত শতাধিক বলপূর্বক গুমের নথি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য- গাড়ির ভেতরে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা, বিষ প্রয়োগ কিংবা রেললাইনে লাশ ফেলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীদের হাতকড়া পরা অবস্থায় লাশ পাওয়া গেছে। এসব তথ্য রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের এক নির্মম বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে।
সত্যের অনুসন্ধান থেকে নীতিগত সংস্কার
তবে ড. নাবিলার নেতৃত্বে কমিশন শুধু তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত সংস্কারের রূপরেখা তৈরির উদ্যোগে পরিণত করেছেন। তার প্রস্তাবিত উল্লেখযোগ্য কিছু সুপারিশ হলো-
• গুমের শিকারদের পরিবারের জন্য ‘ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ চালু করা, যাতে তারা আইনি স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।
• নিখোঁজদের ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আইনগত অধিকার সুরক্ষায় বিশেষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।
• ভুক্তভোগী পরিবারের মানসিক পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার জন্য একটি মানবিক তহবিল গঠন।
এসব সুপারিশ শুধু প্রশাসনিক সংস্কারের নয়; এগুলো এক নতুন মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মর্যাদা ও অধিকারকে কেন্দ্রীয়ভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে।
তথ্য থেকে নৈতিক আন্দোলনে
নাগরিক সমাজের বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. নাবিলা ইদ্রিস কমিশনকে শুধু একটি তথ্য সংগ্রহ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং তিনি এটিকে রূপ দিয়েছেন একটি নৈতিক আন্দোলনে, যেখানে প্রতিটি সাক্ষ্য, প্রতিটি দলিল, প্রতিটি অশ্রু হয়ে উঠছে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দলিল। একজন মানবাধিকার কর্মী মন্তব্য করেছেন, ‘নাবিলা ইদ্রিস হচ্ছেন সেই কণ্ঠ, যিনি ভয় নয়, তথ্যের শক্তিতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। তার মতো মানুষের কারণে মানুষ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায়।’
নারী নেতৃত্বের নতুন প্রতীক
একজন নারী হিসেবে ড. নাবিলার অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে যেখানে নারী নেতৃত্ব এখনো সীমিত, সেখানে তিনি কেবল নেতৃত্বই দিচ্ছেন না- তার কাজের মাধ্যমে মানবাধিকার, ন্যায় ও নীতিনিষ্ঠ গবেষণার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছেন। তার নীরব কিন্তু দৃঢ় উপস্থিতি আজ গুম অনুসন্ধান কমিশনকে দিয়েছে এক বিশ্বাসযোগ্যতা, যা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় খুবই বিরল।
আজ ‘গুম অনুসন্ধান কমিশন’ শুধু নিখোঁজদের তথ্যভাণ্ডার নয়; এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসে ন্যায়, সাহস ও মানবতার নতুন সংলাপ। এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যা রাষ্ট্রের নীরব অন্ধকারের মধ্যে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে- প্রমাণ করছে, জবাবদিহি ও মানবিকতা একসঙ্গে চলতে পারে। আর এই সংলাপের স্থপতি ড. নাবিলা ইদ্রিস। তিনি দেখিয়েছেন, গবেষণা, যুক্তি ও নৈতিকতার সমন্বয়ই পারে সত্যকে পুনরুদ্ধার করতে। তার হাত ধরেই গুম অনুসন্ধান কমিশন পরিণত হয়েছে একটি নৈতিক প্রতিরোধের প্রতীকে- যেখানে তথ্যের প্রতিটি টুকরোই ন্যায়বিচারের পথে আলোর দিশা দেখাচ্ছে।
রাষ্ট্রের নীরবতার মধ্যে এক কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে উচ্চারিত হচ্ছে- একজন নারী, এক গবেষক, এক সাহসী মন- ড. নাবিলা ইদ্রিস, যিনি প্রমাণ করছেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।
তথ্যসূত্র: অপরাজিতা বিডি.কম
/এসএল
.jpg)