বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক অনবদ্য নাম। নারী জাগরণের এক মহান ব্রত মাথায় নিয়ে তিনি সংগ্রাম করে গেছেন আজীবন। নারী শিক্ষার প্রতি সুগভীর আগ্রহ ভাবনার ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। বাংলার রেনেসাঁ কন্যা বেগম রোকেয়ার শিক্ষার জন্য কলম ছিল সদাপ্রস্তুত। সুলতানার স্বপ্ন, অবরোধবাসিনী সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে হাজারো নারীর কণ্ঠে অবরোধ ভাঙার গান রচনা করেছেন। যে কারণে নারীরা আজও জেগে ওঠে তার রচিত সুলতানার স্বপ্নের অজস্র কাণ্ডারি হয়ে।
ভারতের স্বাধিকার আন্দোলনের পুরোধা হায়দরাবাদের কবি সরোজিনী নাইডু সম্পাদিত পত্রিকা ‘Indian Ladies Magazine’-এ ‘Sultana's Dream’ প্রকাশিত হয় ১৯০৫ সালে। এটি প্রকাশিত হওয়ার পরেই বেগম রোকেয়ার শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ আর প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়ে ১৯১৬ সালে সরোজিনী নাইডু একটি সহানুভূতিসূচক চিঠি লেখেন। যা রোকেয়ার লেখালেখি ও কর্মকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে।
তৎকালীন সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে উপেক্ষা করে নারীর অধিকার, মর্যাদাকে পুনর্জীবিত করার যে সাহস দেখিয়েছেন তা রীতিমতো যুদ্ধ জয়ের মতো। রক্ষণশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা একজন নারী কীভাবে নারী জাগরণের জন্য নিজেকে তৈরি করলেন তা সত্যিই অবাক করার বিষয়। বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বড় বোন করিমুন্নেসার একান্ত সহযোগিতা, স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের সমর্থন তার সমকালীন ঘুণে ধরা সমাজের ঘুমন্ত নারী চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হাতিয়ার হিসেবে ভীষণভাবে কাজ করে। যে কারণে বেগম রোকেয়া আজও আমাদের সমাজে এতটাই প্রাসঙ্গিক।
নারীর স্বপ্ন আজ পাখা মেলে বেগম রোকেয়ার দেখানো সুবিশাল আকাশে। নারী ও পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে এবং অধিকার ও মর্যাদার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে উভয়ের সহযাত্রী হয়েছেন। তাই তো তিনি নারী জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে বলেন, নারীরা জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত দেশমাতৃকার মুক্তি অসম্ভব। তিনি শিক্ষা আর জ্ঞানের অভাবকে অনুভব করে বুঝতে পেরেছিলেন যথাযথ শিক্ষায় নারীকে শিক্ষিত করে মুক্ত চিন্তার জগতে প্রবেশ করাতে না পারলে নারী মুক্তি নারী অধিকার কল্পনায় থেকে যাবে। তাই তো তিনি শিক্ষা ও সাহিত্যের মাধ্যমে নারীদের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন।
একজন সুগৃহিণী হতে হলে শিক্ষার দরকার আছে সেটাও তিনি বুঝিয়েছেন মতিচুরের প্রথম খণ্ডে। নারীর মুক্তি আলোয় আলোয়। সব সমাজেরই কেউ না কেউ এই আলোর দীপশিখা জালিয়েছেন। নারীর সহযোগিতায় হাত প্রসারিত করেছেন। যেসব মানুষ নারী মুক্তির জন্য আলো হাতে এগিয়ে এসেছেন বেগম রোকেয়া তাদের মধ্যে অন্যতম, আমরা আজও তার অনবদ্য ভূমিকার কথা সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করি। ডিসেম্বর আসলেই বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবসকে কেন্দ্র করে নারী শিক্ষা ও অধিকার আদায়ে তার অসামান্য অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বাংলাদেশে এটি জাতীয় দিবস হিসেবে প্রতি বছর সরকারিভাবে পালিত হয়। বাংলাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত এই মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরভাস্বর হয়ে থাকুক আজীবন।
লেখক: বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত ২০২১, সহকারী সম্পাদক, খবরের কাগজ
/এস লুপিন
.jpg)