মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের জীবনধারাই হয়ে ওঠে সংগ্রামের আরেকটি সংজ্ঞা। হেলেন কেলার সেই মানুষদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই চরম সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের সামনে প্রতিবন্ধকতা কখনোই শেষ কথা নয়। বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টি মানবজীবনের সবচেয়ে মৌলিক তিনটি ইন্দ্রিয়ই যখন একসঙ্গে হারিয়েও একজন মানুষ বিশ্বসাহিত্য, রাজনীতি ও মানবাধিকারের ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করেন। তখন সেই গল্প শুধু অনুপ্রেরণাই নয়; হয়ে ওঠে শক্তি, সংকল্প ও মানবমর্যাদার পাঠ।
হেলেন কেলার ১৮৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় জন্ম নেন। মাত্র উনিশ মাস বয়সে এক অজানা জ্বরে তিনি দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকশক্তি হারান। অন্ধকার ও নীরবতার সেই অসহ্য দেয়াল তাকে ভেতর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেও পরিবারের অক্লান্ত ভালোবাসা ও শিক্ষিকা অ্যানি সুলিভানের নিষ্ঠা তার জীবনে আলো হয়ে আসে। সুলিভান যখন ছায়া-ঢাকা শিশুটির হাত ধরলেন, তখন কারও কল্পনাই ছিল না যে, এ মেয়েটি একদিন বিশ্বের সামনে মানবধিকার রক্ষার অন্যতম মুখ হয়ে দাঁড়াবে।
সুলিভানের হাত ধরেই হেলেন প্রথম শিখলেন জগৎকে ছুঁয়ে, অনুভব করে, জলরাশির প্রবাহের মতো স্পর্শ দিয়ে শেখা যায়। ‘ওয়াটার’ শব্দটি তার হাতে ম্যানুয়াল সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত আজও মানবশিক্ষার ইতিহাসে অধ্যায় হয়ে আছে। সেখান থেকেই শুরু হেলেনের বিস্ময়কর যাত্রা। তার দুঃসহ সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তিনি মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে র্যাডক্লিফ কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জনের ঘটনা সেই সময়ে বিশ্বে অভাবনীয় ও নজিরবিহীন ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেন, যা তাকে জ্ঞানের আরেক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
শিক্ষাজীবনের পর হেলেন কেলার শুধু নিজের অর্জনে থেমে যাননি। সমাজে যারা প্রতিদিন প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করেন, তাদের জন্য তিনি আজীবন লড়েছেন। বিশেষত প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তিনি ছিলেন অসামান্য সোচ্চার। তার আত্মজীবনী দ্য স্টোরি অব মাই লাইফ প্রকাশিত হওয়ার পর কেবল তিনি একজন সাহিত্যিক হিসেবেই স্বীকৃতি পাননি; বরং প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে সমগ্র বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যায়।
হেলেন কেলার বুঝতে পেরেছিলেন সমাজ শুধু চোখে দেখে বা কানে শোনে না; সমাজ হৃদয়ে গ্রহণ করে মানবিকতার আলো। সেই আলো ছড়াতে তিনি যুক্ত হন রাজনৈতিক আন্দোলন, নারীর অধিকার ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে। তিনি ছিলেন সোশ্যালিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য, ছিলেন শান্তি আন্দোলনের মুখপাত্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেন, যা সমালোচিত হলেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরেননি। কারণ তার বিশ্বাস ছিল হিংসা বা সংঘাত নয়, মানবিকতা ও সমতার ভিত্তিতেই পৃথিবী এগোবে।
১৯২০ সালে তিনি ‘আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন’ ACLU গঠনে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন, যা বিশ্বের অন্যতম মানবাধিকার সংস্থা হিসেবে আজও কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রনেতা, সংগঠক ও সাধারণ মানুষের সামনে প্রতিবন্ধীদের সক্ষমতার বার্তা পৌঁছে দিতে থাকেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লড়াই করেছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, ব্রেইল পদ্ধতির উন্নয়ন, বিশেষ স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য।
হেলেনের জীবনের শক্তি ছিল তার অদম্য আত্মবিশ্বাস যা তাকে প্রতিবন্ধকতার সীমা ভাঙতে বারবার সাহায্য করেছে। তিনি বলেছিলেন, “The only thing worse than being blind is having sight but no vision.” এই একটি বাক্যই তার জীবনের দর্শনকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে চোখে দেখতে না পেলেও মানুষ মনের ভেতর স্বপ্ন দেখতে পারে, আর সে স্বপ্নই তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
নারীদের জন্য বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে হেলেন কেলার এক অসাধারণ অনুপ্রেরণা। কারণ তিনি দেখিয়েছেন, সাফল্যের সংজ্ঞা শরীরের সক্ষমতায় নয়; বরং মানুষের সংকল্প, শেখার আগ্রহ এবং সমাজ বদলানোর ইচ্ছেতে। আজ যখন নারীরা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব সব ক্ষেত্রেই লড়াই করে নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন, তখন হেলেনের গল্প আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তার জীবন শেখায় বাধা আসবে, সীমাবদ্ধতা থাকবে, কিন্তু এগিয়ে যাওয়ার পথও আছে।
একজন নারী, যিনি দৃষ্টি ও শ্রবণ হারিয়েও নিজের পরিচয়ের আলো নিভতে দেননি, তাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় এক অসামান্য উত্তরাধিকার। হেলেন কেলারের সেই আলো আজও নারী ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সাহসের প্রদীপ।
/এস লুপিন
.jpg)