মানব মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে নারীর মস্তিষ্ক স্বভাবগতভাবে বেশি সক্রিয়, বিশেষ করে যেসব অংশ আবেগ, স্মৃতি, সিদ্ধান্ত ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামেন ক্লিনিকস পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, নারীর মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন গড়ে পুরুষের তুলনায় বেশি এবং এটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ও লিম্বিক সিস্টেমে উচ্চ কার্যক্রম সৃষ্টি করে। অর্থাৎ নারীরা একদিকে আবেগগত সূক্ষ্ম বিষয় দ্রুত বুঝে, অন্যদিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গভীরতা দেখায়। এই গবেষণা মস্তিষ্ক নিয়ে প্রচলিত বহু ধ্যানধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
নারীর মস্তিষ্কের এই সক্রিয়তা তার দৈনন্দিন আচরণ, কর্মদক্ষতা এবং সম্পর্ক পরিচালনায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। গবেষণা বলছে নারীরা একই সময়ে একাধিক কাজ করতে পারদর্শী এবং আবেগ-সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণে অধিক দক্ষ। তাদের হিপোক্যাম্পাস বা স্মৃতি-নিয়ন্ত্রণ অংশও তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে, ফলে শেখা ও মনে রাখার ক্ষমতা বেশি স্থায়ী হয়। এ বৈশিষ্ট্যগুলো জন্মগত হলেও অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হয়। তাই ব্যক্তিগত জীবন থেকে কর্মক্ষেত্র নারীর প্রতিটি পদক্ষেপে এই মস্তিষ্কগত সুবিধা তার আত্মবিশ্বাস ও কার্যকারিতা বাড়িয়ে তোলে।
তবে বেশি সক্রিয়তা সুবিধা দিলেও কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। গবেষকরা উল্লেখ করেন, নারীর লিম্বিক সিস্টেম বেশি সক্রিয় হওয়ায় আবেগ-সংবেদনশীলতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি দুশ্চিন্তা বা অতিরিক্ত ভাবনা অনেক সময় মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক প্রত্যাশার দ্বৈত চাপ নারীর ওপর বাড়তি মানসিক বোঝা তৈরি করে। তবুও এই সক্রিয়তাই তাকে সম্পর্ক, দায়িত্ব ও জটিল পরিস্থিতিতে আরও সহানুভূতিশীল ও কার্যকর করতে সাহায্য করে।
মজার ব্যাপার হলো, সমাজ দীর্ঘদিন ধরে নারীর মস্তিষ্ককে কম যুক্তিনির্ভর বা দুর্বল ভাবতে অভ্যস্ত ছিল। ‘নারীরা আবেগপ্রবণ, তাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না’—এমন ধারণা বহু স্থানে এখনো প্রচলিত। অথচ বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে নারীর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা সিদ্ধান্ত ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অংশই তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা সতর্ক, বিশ্লেষণী এবং পরিস্থিতির বহুমাত্রিক দিক বিবেচনা করতে সক্ষম। সমাজের এ ভুল ধারণাই নারীর যোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং তার সাফল্যকে ‘বিস্ময়’ হিসেবে দেখায়, স্বাভাবিক হিসেবে নয়।
নারীর মস্তিষ্কের সক্রিয়তা সবচেয়ে প্রকটভাবে প্রতিফলিত হয় নেতৃত্ব, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা ও মানবসম্পর্ক ব্যবস্থাপনায়। কর্মক্ষেত্রে বর্তমানে যে তিনটি গুণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স, মাল্টিটাস্কিং এবং ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সে তিনটিতেই নারীরা গড় হিসেবে এগিয়ে। আন্তর্জাতিক বেশ কিছু গবেষণা বলছে, যেখানে নেতৃত্বে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, সেখানে কর্মপরিবেশ হয় সহযোগিতামূলক, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নশীল। কর্মীরা মনোবল পায় এবং সিদ্ধান্তে আসে বৈচিত্র্য। অর্থাৎ নারীর মস্তিষ্কের সক্রিয়তা শুধু তার ব্যক্তিগত শক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের উন্নয়নেরও একটি বাস্তব হাতিয়ার।
স্ট্রেস মোকাবিলায় নারীর মস্তিষ্কের আচরণ পুরুষদের থেকে ভিন্ন। পুরুষরা যেখানে চাপের মধ্যে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া দেখায়, নারীরা সেখানে ‘টেন্ড অ্যান্ড বিফ্রেন্ড’ অর্থাৎ শান্তভাবে পরিস্থিতি বোঝা, সম্পর্ক রক্ষা এবং সমর্থন খোঁজার পথ বেছে নেয়। এটি মস্তিষ্কের সক্রিয় আবেগকেন্দ্র ও সামাজিক সংবেদনশীলতার ফল। এ বৈশিষ্ট্য পরিবার পরিচালনা, সন্তান লালন, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা যেকোনো মানবিক পেশায় নারীর দক্ষতাকে বাড়িয়ে দেয়।
তবে প্রশ্ন হলো নারীর মস্তিষ্ক বেশি সক্রিয়, এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা সমাজ কীভাবে দেখছে? আমরা কি সত্যিই নারীর সক্ষমতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখি? নাকি এখনো পুরোনো ধারণার ছায়ায় নারীর প্রতিভাকে মূল্যায়ন করি? সামাজিকভাবে নারীকে এখনো অনেক সময় আবেগী হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু সেই আবেগই আসলে তার বিশ্লেষণী ও মানবিক নেতৃত্বের শক্তি। বিজ্ঞান বলছে নারীর এই সক্রিয় মস্তিষ্কই তাকে সম্পর্ক, দায়িত্ব, কাজ, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতায় ভিন্ন ধরনের সমন্বয় ক্ষমতা দেয়।
অতএব, নারীর সাফল্য কোনো ব্যতিক্রম বা বিস্ময় নয় এটি তার স্বাভাবিক সক্ষমতার একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা মিথ ভাঙতে হলে প্রয়োজন নারীর মস্তিষ্ককে ঘিরে এসব বৈজ্ঞানিক তথ্য সমাজে পৌঁছে দেওয়া এবং নারীকে আবেগ বা দুর্বলতার গণ্ডিতে আটকে না রেখে তার বহুমাত্রিক বুদ্ধিমত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। বিজ্ঞান যেমন বলছে, নারীর মস্তিষ্ক আরও সংযুক্ত, আরও সক্রিয় এবং আরও সৃজনশীল; তাই তার ক্ষমতাকে ‘অসাধারণ’ মনে না করে বরং ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।
/এস লুপিন