রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বধ্যভূমি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বেদনার অধ্যায়। পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসরদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ভয়াল স্মৃতি। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রাণপণে লড়ছিল; তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই স্থানে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল। জুলুম-নির্যাতন, ধর্ষণ, লুটপাট ও নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে তারা। এতে নাম না জানা অসংখ্য শহিদের আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভটি। আজও এই স্থানটি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর হয়ে আছে ও স্বাধীনতার জন্য অর্পিত প্রাণের বেদনাদায়ক স্মৃতি বহন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ শামসুজ্জোহা হলের সামনের রাস্তা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার পূর্ব দিকে হেঁটে গেলেই দেখা যায় ইটের তৈরি একটি লাল স্তম্ভ। স্তম্ভটির অবস্থান সমতল থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে। এটি দাঁড়িয়ে আছে গোলাকৃতি একটি কূপের মধ্যে। কূপের চারপাশে বানানো হয়েছে কংক্রিটের গোলাকার বেদি। এই স্তম্ভের বেদিতে উঠতে হলে প্রথমে জুতা খুলতে হয়। তারপর সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। আর এই সিঁড়ির দুই ধারে রয়েছে হাজারও ফুলগাছ। বেদিতে উঠলেই দেখা যায় কূপের গভীর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ৪২ ফুট উঁচু ইটের স্তম্ভ। এ স্তম্ভটিই বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের এক টুকরো ইতিহাস।
জানা যায়, ১৯৭১ সালে রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, যুবক-যুবতীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষদের ধরে এনে নির্যাতন করত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলকে মিনি ক্যান্টনমেন্টে পরিণত করেছিল তারা। অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন শেষে নিরপরাধ মানুষগুলোকে কখনো জীবিত বা মৃত অবস্থায় গণকবর দেওয়া হয়েছিল এই এলাকাজুড়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একে একে সন্ধান মিলতে থাকে এই গণকবর বা বধ্যভূমির। পচা, গলিত, অর্ধগলিত বিকৃত দেহাবশেষ থেকে স্বজনদের খুঁজে বের করেছেন অনেকেই। কেউ পরনের জামা, হাতের ঘড়ি-আংটি, শারীরিক গড়ন বা বৈশিষ্ট্য বা অন্য কোনো প্রমাণ দেখে খোঁজার চেষ্টা করেছেন প্রিয়জনদের। স্বাধীনতার পর রাবির বধ্যভূমির এই গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের জন্য মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এসেছিল অসংখ্য মাথার খুলি ও শরীরে বিভিন্ন অঙ্গের হাড়গোড়।
অজস্র বেদনার স্মৃতিতে ঘেরা এই স্থানে প্রতিদিন কয়েকশ দর্শনার্থী বেড়াতে আসেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজনরাও বেড়াতে আসেন এখানে। এ ছাড়া কেউ রাজশাহীতে ঘুরতে এলে এখানে বেড়াতে আসেন ও শহিদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে যান।
বন্ধুদের সঙ্গে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ও বেড়াতে এসেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের শিক্ষার্থী শাহেদ আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা প্রথমে এখানে আড্ডা দিতে ও মজা করতে আসতাম। কিন্তু এই স্তম্ভের ইতিহাস সম্পর্কে জানার পর আমরা শহিদদের স্মরণ করতে এখানে আসি।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সাংবাদিক ছিলেন আহমদ সফিউদ্দিন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বধ্যভূমি সংলগ্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালান তিনি। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জোহা হলকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে পরিণত করেছিল। বিভিন্ন উপায়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় নারী-পুরুষ, যুবকদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। তারা হলের কয়েকটি কক্ষকে টর্চার সেল বানিয়েছিল। হলে তথাকথিত আদালতে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করত তারা। বিচার শেষে বিভিন্নভাবে নির্যাতন এবং হত্যা করা হতো বন্দিদের।’
গণহত্যার বিষয়ে এ সাংবাদিক আরও বলেন, ‘জোহা হলের পেছন দিকের এলাকায় ইটের ভাটা ছিল। প্রথমদিকে পাকিস্তানি বাহিনী মানুষকে হত্যা করে ইটের ভাটার মধ্যে ফেলে রাখত। পরে মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে তারা মানুষকে মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখতে শুরু করে। এমনও খবর পাওয়া গেছে, যাদের ওই খানে নিয়ে হত্যা করা হতো, তাদের দিয়েই আগে কবর খোঁড়া হতো। জোহা হলের পেছনের ওই পুরো এলাকায় ৩০টির বেশি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব কবর থেকে ঘড়ি, মেয়েদের কানের দুল, গলার হার, আংটিসহ বিভিন্ন জিনিস পাওয়া গেছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, নারী-পুরুষ কেউ রক্ষা পায়নি পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচার থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ১৯৯৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল খালেক সরকারের কাছে সুপারিশ করেন। তারপর পরবর্তী উপাচার্য অধ্যাপক এম. সাইদুর রহমান খান ১৯৯৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্থানটিতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন।