অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে মাদারীপুরের ডাসারে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলছে মাতম। ওই দুই ভাই তিন মাস আগে মারা গেলেও বিষয়টি গোপন রাখে পাচারকারী চক্র।
এ ঘটনায় দালালের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
একসঙ্গে দুই সন্তানের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না মা মায়া বেগম। তার আহাজারিতে ভারী হয়ে গেছে আশপাশের পরিবেশ। দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে ওই বাড়িতে ছুটে আসছেন পাড়া-প্রতিবেশীরাও। কোনো সান্ত্বনাতেই থামছে না স্বজনদের কান্না।
নৌকাডুবিতে মৃতরা হলেন ডাসার উপজেলার পশ্চিম পূয়ারী গ্রামের সিরাজ মুন্সীর ছেলে মিলন মুন্সী (৩৫) ও আল আমিন মুন্সী (৩২)।
ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাত মাস আগে অবৈধভাবে ইতালির উদ্দেশে রওনা দেন তারা। মাঝপথে লিবিয়া গিয়ে তারা কিছুদিন অবস্থান করেন। পরে গত ২৭ মে লিবিয়া থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় অর্ধশত মানুষের সঙ্গে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন দুই ভাই। তবে ভূমধ্যসাগরে তাদের বহনকারী নৌকাটি ডুবে গেলে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হয়।
পাচারকারী চক্র বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন রাখলেও বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) সকালে একসঙ্গে যাত্রা করা তাঁতীবাড়ি এলাকার ইসরাফিলের মাধ্যমে মিলন ও আল আমিনের মৃত্যুর খবর এলে পরিবারে শুরু হয় মাতম।
স্বজনরা জানান, মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম সদস্য গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরহাদ মাতুব্বর সহজে ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখান। এতে ধারদেনা করে ৩০ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দেন স্বজনরা। একদিকে স্বজন হারানোর শোক, অন্যদিকে ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দুই ভাইয়ের পরিবার। এ ঘটনায় জড়িত দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
ঘটনার পর থেকে পলাতক অভিযুক্ত ফরহাদ মাতুব্বর। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে মৃত মিলনের স্ত্রী ও তিন বছরের এক ছেলে রয়েছে। আর আল আমিনের স্ত্রী ও এক বছরের একটি ছেলে রয়েছে।
ছেলেহারা মা মায়া বেগম বলেন, ‘ফরহাদ চেয়ারম্যান প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নেয়। তখন বলেছিল সুন্দরভাবে আমার দুই ছেলেকে ইতালি পাঠাবে। কিন্তু এভাবে আমার দুই ছেলের মৃত্যু হবে, এটা মেনে নিতে পারছি না। এ ঘটনার বিচার চাই। আর ধারদেনা পরিশোধে সরকারের সহযোগিতা চাই।’
ডাসার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইতালি যাওয়ার পথে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবরটি বিভিন্ন অনলাইনের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। ওই পরিবার থেকে এখনো কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ডাসারের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার দাশ জানান, মিলন ও আল আমিনের পরিবার থেকে এখনো বিষয়টি প্রশাসনকে জানায়নি। তবে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মানব পাচারের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।