বৃহস্পতিবার (১২ জুন) সকাল সাড়ে ৯টা। ভোলা সদর উপজেলার তুলাতুলী এলাকা। সেখানে থাকা মেঘনা নদীর পাড় থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে ৮-৯টি ড্রেজার বালু তুলছিল। ওই বালু জিও ব্যাগে ভরে পাশেই নদীর তীর সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছিল। সেখান থেকে কিছুটা দূরে কাঠির মাথা এলাকায় গিয়ে দেখা যায় একই চিত্র। নিয়ম অনুযায়ী, যেখানে নদীর তীর সংরক্ষণে কাজ হয় তার থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে বালু তোলার কথা। কিন্তু এই দুই জায়গায় নদী পাড়ের ১০০ মিটারের মধ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। শুধু এই দুই জায়গা নয়, একই দিন বিকেলে বোরহানউদ্দিন উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর গঙ্গাপুর এলাকায় নদীর তীর ঘেঁষে ড্রেজার দিয়ে বালু তুলতে দেখা যায়। ওই বালু বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলার সাত উপজেলায় নদী তীরবর্তী এলাকায় চারটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব এলাকার নদীভাঙন রোধ, কৃষিজমি ও বসতবাড়ি রক্ষা করাই প্রকল্পগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। কারণ, ড্রেজার দিয়ে যে বালু তোলা হচ্ছে সেই বালু দিয়েই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে! আবার তীর সংরক্ষণে জিওব্যাগে বালু ভরে সেগুলো আবার একই জায়গায় ফেলা হচ্ছে। এতে বালুভর্তি জিওব্যাগগুলো স্রোতের টানে ড্রেজারে খনন করা জায়গায় চলে যাচ্ছে। ওই বালু আবার তুলে একই কাজ করা হচ্ছে। আর সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, বাঁধের জন্য বালু তোলা হচ্ছে বাঁধের ১০০ মিটারের আশপাশে থেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার অর্ধশতাধিক জায়গায় ড্রেজার দিয়ে নদীর তীর থেকে এভাবে বালু তোলা হচ্ছে। এলাকাবাসী বলছেন, নদীর প্রাকৃতিক স্রোতকে উপেক্ষা করে অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলে নির্মাণ করা এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বছর না ঘুরতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব কাজের কারণে ভাঙনকবলিত এলাকা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে কেউ কথা বলছেন না।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চারটি প্রকল্পে ৩ হাজার ৪৬৩ কোটি ১০ লাখ টাকার কাজ চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ, সিসি ব্লক, স্লুইসগেট নির্মাণ, সাব মার্সিবল স্পার নির্মাণ, জিও ব্যাগ ও টিউব ডাম্পিং এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছে।
কথা হয় মনপুরা উপজেলার বাসিন্দা রাকিব মোল্লার সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ঠিকাদারের এমন অনিয়মের কারণে পাউবোর হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়েছে। ভাঙন থেকে লোকালয় রক্ষার পরিবর্তে বেশি লাভের আশায় ঠিকাদাররা সরকারি টাকা মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার জলে ভাসিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন।’ একই অভিযোগ করেন ওই এলাকার মো. সোহান, মিজাম পাটোয়ারী, হৃদয়, বাদশা মিয়াসহ আরও কয়েকজন।
তজুমদ্দিন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ খুবই নিম্নমাণের। এভাবে তীরের কাছ থেকে বালু তুলে বাঁধে দেওয়া হলে নতুন বাঁধগুলো ধসে পড়বে।’ বিষয়টি নিয়ে পাউবোর কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ার কথা জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে বাঁধ তৈরি করলে তা পানি প্রবাহ ও মাটির চাপ সহ্য করতে পারে না। ফলে এক মৌসুম পার না হতেই বাঁধ ধসে পড়ে। ভোলা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুব আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে নদীর তীর ঘেঁষে ড্রেজার বসিয়ে তোলা বালু ব্যবহার করলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এতে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং এক জায়গা রক্ষা পেলে অন্য জায়গায় তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এটি টেকসই কোনো সমাধান নয়।’
ভোলা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ‘আমরা ভোলাবাসীর’ সদস্য নজরুল হক অনু বলেন, ‘অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন- প্রকল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নদীর চরিত্র বুঝে পরিকল্পনা না করলে প্রকল্প ব্যর্থ হবে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণ।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত নির্দিষ্ট ড্রেজিং এলাকা না মেনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে প্রকল্পের পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে বালু তোলে। এতে নদীর তীর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভোলা জেলা উন্নয়ন ও স্বার্থরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ রায় অপু বলেন, ‘যেই এলাকায় কাজ হয়, ঠিকাদাররা পাশেই ড্রেজার বসায়। এতে তারা পরিবহন খরচ বাঁচায়। কিন্তু সে জন্য ভবিষ্যতে একই জায়গায় আবার ভাঙন শুরু হয়। এই লুকোচুরি বন্ধ না হলে প্রকল্পের অর্থ অপচয় হবে। এভাবে দুর্নীতি আর অদক্ষ পরিকল্পনার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে ভোলার ভবিষ্যৎ।’
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। অনেককে ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। তবে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন প্রকল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ভোলা-১ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দীন আরিফ। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ পর্যবেক্ষণ করছি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অপরিকল্পিত বালু তোলা বন্ধের পাশাপাশি তীরের এক কিলোমিটার দূর থেকে বালু তোলার নির্দেশনার কথা জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘নিরাপদ দূরত্ব থেকে বালু তোলা না হলে বাঁধ ঢলে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এ বিষয়ে জোরালো মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’