খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ভয়ংকর হয়ে উঠছে রাতের নগরী। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের টহল থাকলেও সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রতি রাতেই বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরে নতুন করে অপরাধ তৎপরতা শুরু করেছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, পেশিশক্তির প্রদর্শন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড তারা করে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিকসংকট, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী। তবে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৫ জুন রাতে নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে এসএম সাজিত হাসান নামে এক যুবককে সড়কে ধাওয়া করে গুলির ঘটনা ঘটে। সাজিত গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রাত ৯টার দিকে তিনি রিকশায় শিববাড়ি থেকে বাগমারা এলাকায় নিজ বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলে দুই ব্যক্তি তাকে অনুসরণ করে। বিষয়টি টের পেয়ে সিটি মেডিকেল কলেজের সামনে রিকশা থেকে নেমে সাজিত দৌড়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। এ সময় মোটরসাইকেল থেকে নেমে একজন তাকে ধাওয়া করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এর মধ্যে একটি গুলি সাজিতের কোমরের বাম পাশে ও আরেকটি ডান হাঁটুর ওপরে বিদ্ধ হয়। গুলির শব্দে আশপাশের মানুষ জড়ো হলে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।
একই রাতে নগরীর রেলিগেট চার রাস্তার মোড়ে আলামিন (৩২) নামে এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। আলামিন হাত দিয়ে ধারালো অস্ত্র ঠেকানোর চেষ্টা করলে ডান হাতের কয়েকটি আঙুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রায় একই সময় নিরালা রোডে সোনাপোতা স্কুলের বিপরীতে নয়ন শেখ নামের আরেক যুবককে ছুরিকাঘাত করা হয়।
জানা যায়, ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসীরা এলাকায় ফিরে নতুন করে অপরাধ তৎপরতা শুরু করেছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, পেশিশক্তির প্রদর্শন, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণসহ একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ময়লাপোতা মোড়ে দুর্বৃত্তরা গুলি করে শেখ সাদেকুর রহমান ওরফে বিহারি রানা নামে এক যুবককে হত্যা করে।
এদিকে পর পর কয়েকটি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অবৈধ অস্ত্রের উৎস খুঁজতে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় মে মাসে ১০টি হত্যা, ১৩টি ধর্ষণ, অস্ত্র আইনে পাঁচটি, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ২৩টিসহ মোট ৩২৪টি মামলা হয়, যা গত এপ্রিল মাসে হওয়া মামলার চেয়ে ১৫টি বেশি।
এদিকে খুলনায় হঠাৎ করেই নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। খুলনা ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের আড়াইশর বেশি সহিংসতার ঘটনা আইনজীবীরা নথিভুক্ত করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আর্থিকসংকট, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
পুলিশ জানায়, গত ৮ জুন রাত দেড়টার দিকে রূপসার জয়পুর এলাকায় ২৩ বছরের এক তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ৭ জুন রাতে রূপসার আইচগাতিতে শ্বশুরবাড়িতে খুন হন সুমাইয়া খাতুন (২৩) নামে এক তরুণী। তিনি প্রবাসী শাওন শেখের স্ত্রী। রূপসা থানার ওসি মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান জানান, গভীর রাতে কে বা কারা গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী মোমিনুল ইসলাম জানান, আদালতে মামলার জটের কারণে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এদিকে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সামাজিক সংগঠন ‘নাগরিক আন্দোলন’। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য মাদক কারবার, এলাকার কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ, মহল্লার আধিপত্য ও নেতৃত্বের কোন্দল দায়ী।
খুলনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ ইমরান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা থানায় করা হলে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শেষ করে ও আসামিদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশ এ ধরনের অপরাধ তৎপরতা বন্ধে সক্রিয় রয়েছে।’