নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী পৌর শহরের ছোট মাধবদী মহল্লার বাসিন্দা মিলন মিয়ার দ্বিতীয় ছেলে মো. আসিফ ইকরাম। লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি কারখানায় কাজ করতেন ২৩ বছরের আসিফ। জুলাই আন্দোলনে অংশ নিলে তার ডান চোখে গুলি লাগে। এরপর চারবার অপারেশন করেও সেই গুলি বের করতে পারেননি চিকিৎসকরা। বর্তমানে চোখে গুলি নিয়ে যন্ত্রণায় দিন পার করছেন তিনি।
রবিবার জুলাইযোদ্ধা আসিফ ইকরামের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। তিনি বলেন, ‘নিজেকে উৎসর্গ করে দেশ থেকে স্বৈরাচার সরকারের পতন ঘটাতে ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে নামি। আন্দোলনের সময় আমার ডান চোখে গুলি লাগলেও স্লোগান ছাড়িনি। একসময় চারদিক অন্ধকার হয়ে অচেতন হয়ে মাঠিতে লুটিয়ে পড়ি। সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি।’
তিনি বলেন, ‘সারা দেশ যখন উত্তাল হয়ে ওঠে, যখন আবু সাঈদ ভাই নিজের বুক পেতে দেন এবং পুলিশের গুলিতে শহিদ হন, তখন বিষয়টি মানিয়ে নিতে পারিনি। প্রয়োজনে আমিও শহিদের তালিকায় চলে যাব, এটা মেনে নিয়েই আন্দোলনে নামি। আমাদের একটা গ্রুপ ছিল, সেখান থেকে মেসেজ ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনা আসত।’
খবরের কাগজকে আসিফ ইকরাম আহত হওয়ার ঘটনার দিনের বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ, তখন আমরা কয়েকজন মিলে নিজের এলাকা থেকে কীভাবে আন্দোলন শুরু করব, সেই চিন্তা করি। সেদিন ছিল ১৮ জুলাই। বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা করি কীভাবে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্দোলন করা যায়। সেদিন বেলা ১১টার দিকে মাধবদী প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার মোড় থেকে একটি মিছিল বের করি আমরা। সামনে থেকে আমি স্লোগান দিচ্ছিলাম। মিছিলটি শীতলাবাড়ি মোড়ে পৌঁছালে মিছিলের ওপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। এ সময় আমার ডান চোখে গুলি লাগে।’
তিনি জানান, প্রথমে তার সহযোদ্ধারা তাকে প্রাইম হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসার কোনো উপায় না পেয়ে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশের নজরদারিতে সেখানে আরও ভয়াবহ অবস্থা ছিল। এ ছাড়া সেখানে চোখের চিকিৎসাও ছিল না। পরে স্বজনরা তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। ১৮ তারিখ থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি বিনা চিকিৎসায় ভোগেন।
তিনি আরও জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ২ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান পেয়ে সেটি তার চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেন। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার থেকে আরও ১ লাখ টাকা পান। তবে চোখে চারবার অপারেশনসহ বছরজুড়ে চিকিৎসার খরচ নিয়ে তার পরিবার এখন টানাপোড়েনের মধ্যে চলছে।
আসিফ বলেন, ‘আমাদের দাবি জুলাই সনদ, আহত ও নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং আমাদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত জুলাই সনদ দিতে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আরেকটি জুলাই চলে এসেছে। কিন্তু কোনো সুরাহা নেই। মনে হচ্ছে, এখন আবার আন্দোলনে নামতে হবে।’
আসিফের বাবা মিলন মিয়া জানান, তার চার ছেলেসন্তান। এর মধ্যে বড় ছেলে শারীরিকভাবে অসুস্থ। দ্বিতীয় ছেলে আসিফ ইকরাম গ্রিনফিল্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। আসিফ লেখাপড়ার পাশাপাশি চাকরি করে পরিবারকে সহায়তা করতেন। অন্য দুই ছেলে স্কুলছাত্র। আন্দোলনে আসিফের চোখে গুলি লাগায় এখন কোনো কাজ করতে পারেন না। এ ছাড়া তার লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবে আসিফকে দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না।’
উল্লেখ্য, সরকারি গেজেটে জুলাই আন্দোলনে নরসিংদীতে ২২ জন নিহত ও ৩৩৫ জন আহতের নাম রয়েছে।