চাঁদপুরের আট উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ শূন্য। এসব পদে কোনো দাপ্তরিক চিঠি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা। মৌখিক অনুমতির মাধ্যমে হিসাব সহকারীরা এখন প্রশাসনিক কর্মকর্তার চেয়ারে। শুধুই তাই নয়, তাদের নামে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংকের যৌথ হিসাব। স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর বলছে, এভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য অবশ্যই দাপ্তরিক চিঠি দিতে হবে।
একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ শূন্য হলে এই পদে পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজ করবেন। এই বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউপি-২ শাখা থেকে ৫০৭ স্মারকে সর্বশেষ ২০২০ সালের চিঠিতে বলা হয়েছে, হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা কখনোই ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে পারবে না।
এদিকে, ২০১৯ সালের ৬৪৫ স্মারকের চিঠিতে হিসাব সহকারীদের কর্মবণ্টনসংক্রান্ত বিস্তারিত বলা রয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তার অনপুস্থিতিতে হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগপ্রাপ্তরাও কাজ করতে পারবেন। কিন্তু তাদের ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিষয়ে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই প্রকাশিত গেজেটে ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাবের সব আয়-ব্যয় চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। অথচ চাঁদপুর জেলায় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার ১৩টি শূন্য পদে এই ধরনের নিয়ম অনুসরণ না করে মৌখিক অনুমতিতে হিসাব সহকারীরা দায়িত্বসহ ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করছেন।
জেলার কচুয়া উপজেলার সদর দক্ষিণ ইউনিয়ন ও পাথৈর ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা গেছে, হিসাব সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার চেয়ারে বসে সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার নির্দিষ্ট কক্ষ থাকলেও ব্যবহার হচ্ছে না।
কচুয়া সদর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের হিসাব সহকারী নাছির হোসেন সোহেল বলেন, ‘আমরা এই পদে থাকলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে আমাদের পদোন্নিতর জন্য উচ্চ আদালতে রিট করা হয়েছে।’ তিনি কেন তার নিজস্ব কক্ষ ব্যবহার না করে অস্থায়ী দায়িত্ব হিসেবে প্রশাসনিক কর্মকর্তার কক্ষ ব্যবহার করছেন এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রেগে যান। বলেন, ‘চেয়ার কোনো সমস্যা নয়।’ তিনিও চেয়ারম্যানসহ তার নিজ নামে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করছেন। ইউনিয়ন পরিষদের সব উন্নয়ন বরাদ্দ এবং জেনারেল অ্যাকাউন্টের টাকা এসব হিসাবে জমা হয়।
একই অবস্থা ২ নম্বর পাথৈর ইউনিয়ন পরিষদে। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আক্কাছ মোল্লার বাড়িতে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিষদের কোনো ভবন নেই। এই পরিষদে গত দুই মাসে আগে হিসাব সহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছেন মো. আলমগীর হোসেন। পরিষদের চেয়ারম্যান আক্কাছ মোল্লা বলেন, ‘আমি নিজে চেয়ারম্যান হিসেবে নতুন। এখানে যিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন তিনি অন্য ইউয়িনে বদলি হয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে শূন্য পদের কথা জানানো হলে তিনি হিসাব সহকারীকে যোগদান করার জন্য বলেন। তবে তিনি (হিসাব সহকারী) কাজে অতটা অভিজ্ঞ না। আগের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সহায়তা নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
চেয়ারম্যান আক্কাছ মোল্লাকে জিজ্ঞাসা করা হয় হিসাব সহকারী কীভাবে যৌথ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন এবং অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিষয়ে দাপ্তরিক কোনো চিঠি আছে কি না। তিনি বলেন, ‘কোনো চিঠি নেই। ইউএনও মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন। ইউএনও বলেছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জেলা অফিস থেকে বলা হয়েছে এভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য।’
হাজীগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইউসুফ প্রধানীয়া সুমন বলেন, ‘ইউনিয়নে প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ শূন্য হলে, আমি ইউএনওর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছি। আপাতত হিসাব সহকারী দায়িত্ব পালন করছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা উত্তোলন করতে অব্যশই হিসাব সহকারীর নামে অ্যাকাউন্টে নাম পরিবর্তন করতে হবে। তবে আমাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে কোনো চিঠি দেওয়া হয়নি।’
এই ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন করে আসা হিসাব সহকারী ইউসুফ সরকার রুবেল কাজ করছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তার চেয়ারে বসে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি নিজের চেয়ার রেখে এই চেয়ারে কেন, তিনি বলেন, ‘এমনিতে বসেছি।’ অথচ ইউনিয়ন পরিষদে প্রবেশ করেই তাকে এই কক্ষে পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দাপ্তরিক অনুমতি ছাড়া হিসাব সহকারীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের মৌখিক অনুমতি দিয়েছেন স্থানীয় সরকারি বিভাগের উপসচিব মো. গোলাম জাকারিয়া।
হাজীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইবনে আল জায়েদ হোসেন বলেন, ‘হিসাব সহকারীরা যে প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন, তা আমি জানি। তবে তাদের দাপ্তরিক কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই বিষয়ে আপনি স্থানীয় সরকার উপ-পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন।
কচুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ হেলাল চৌধুরী বলেন, ‘হিসাব সহকারী যখন প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন, তখন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কে পরিচালনা করবে! তাকে দিয়েই করাতে হবে।’ দাপ্তরিক অনুমতি দেওয়া হয়নি বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে বক্তব্য প্রয়োজন হলে জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগে কথা বলেন।’
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘জেলায় ১৩টি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। কিন্তু হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদের লোকজন উচ্চ আদালতে রিট করেন তাদের এই পদে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য। যার ফলে এই পদে নিয়োগ হয়নি। তাদের রিট উচ্চ আদালত স্থগিত করে রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে শূন্য পদে হিসাব সহকারীদের দায়িত্ব পালনের জন্য বলা হয়েছে এবং হিসাব সহকারীদের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকলে তারা দায়িত্ব পালন করবেন।’
তিনি বলেন, ‘ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কোথাও উল্লেখ নেই। দায়িত্ব পালনের জন্য আমরা কোনো দাপ্তরিক চিঠি দেইনি। তবে হিসাব সহকারী হিসেবে বদলির চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ-২-এর কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. নুরে আলম বলেন, ‘কোনো ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা না থাকলে পাশের ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু হিসাব সহকারী থাকলে তিনিই প্রশাসনিক কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে নিয়মিত কাজ সম্পাদন করবেন। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে দাপ্তরিক চিঠি ও নিয়ম অনুসরণ করে দায়িত্ব দিতে হবে।’